পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। একই সাথে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির তোয়াক্কা না করে লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক জেনারেলসহ বেশ কয়েকজন সেনা নিহতের ঘটনায় পুরো অঞ্চল জুড়ে সর্বাত্মক যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আজ শনিবার (৬ জুন) ভোরে ঘটা এই পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে কুয়েত ও বাহরাইনসহ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী (বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল পরিবহন রুট) এবং এর আশপাশের অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সরাসরি যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তারা আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। অন্তত চারটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্টেশনগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে। অন্যদিকে, ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা মেহর নিউজ দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উসকানিমূলক অবস্থান পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়াতেই ইরান এই সতর্কতামূলক গুলিবর্ষণ করেছে।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার ধাক্কা লেগেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলোতেও। শনিবার ভোররাতে আকস্মিকভাবে কুয়েত এবং বাহরাইন জুড়ে যুদ্ধকালীন সতর্কতার সাইরেন বেজে ওঠে, যা স্থানীয় জনগণের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আকাশপথে যেকোনো সম্ভাব্য হামলা রুখতে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে, বাহরাইন সরকার তাদের নাগরিকদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ জারি করেছে। দেশটি দাবি করেছে, ইরান থেকে ধেয়ে আসা তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং বেশ কয়েকটি ড্রোন তারা সফলভাবে প্রতিহত করেছে।
এদিকে, লেবানন ও ইসরায়েল সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বজায় থাকা সত্ত্বেও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে লড়াই নতুন করে তীব্র রূপ নিয়েছে। লেবাননের সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলায় তাদের একজন জেনারেলসহ বেশ কয়েকজন নিয়মিত সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এর আগের দিনও ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ২০ জন বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানির খবর দিয়েছিল লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইরানকে নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেছেন যে, তেহরান তার ভূখণ্ডকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দান এবং নিজেদের স্বার্থের ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করছে। এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লেবাননের প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে বলেন, লেবাননকে তার আসল শত্রু ইসরায়েলের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার দিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে সুর বদলাতে দেখা গেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। এর আগে নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি মাত্র ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন তিনি দৃশ্যত দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন মাস পার করে ফেলেছি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে চলেছিল, আর আমি তো মাত্র তৃতীয় মাসে পদার্পণ করেছি।’ ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মার্কিন প্রশাসন খুব দ্রুত এই সমস্যার কোনো কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে পারছে না।
তবে রণক্ষেত্রের এই উত্তেজনার সমান্তরালে নেপথ্যে পারমাণবিক কূটনীতির তৎপরতাও লক্ষ্য করা গেছে। যখন পারস্য উপসাগরে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় চলছে, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারকে টেনেসি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি (যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র)-তে পরমাণু বিজ্ঞানীদের সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক করতে দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের এই তীব্রতার মাঝেই ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো পারমাণবিক আলোচনার খসড়া বা রূপরেখা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে হোয়াইট হাউস।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ (পরোক্ষ যুদ্ধ) এখন সরাসরি পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর এই মুখোমুখি অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে লেবাননের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ব্যর্থতা এবং সেখানে নিয়মিত সেনাসদস্যদের প্রাণহানি এটিই প্রমাণ করে যে, কেবল মৌখিক চুক্তি দিয়ে এই অঞ্চলের স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বিশ্বনেতারা যদি দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হন, তবে এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বিশ্বজুড়ে এক নতুন মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।