একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি হলেও দীর্ঘ পাঁচ দশকে সেই ইতিহাসকে একটি সর্বজনীন ও অভিন্ন কাঠামোয় দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ভাস্কর্যে হামলার প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের এই সংকটের কথা পুনরুল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক ও কলা অনুষদের সাবেক ডিনের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আমাদের জাতিগত উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। যারা সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বিধাবিভক্তি এবং নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করার প্রবণতা ইতিহাসের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। তিনি মনে করেন, ভাস্কর্য ভাঙার পেছনে কাজ করেছে একদল মানুষের কট্টরপন্থী মনোভাব ও সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা। প্রকৃত আলেমদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি হওয়ায় ধর্মীয় বোধের নামে ভুল ব্যাখ্যা জনমনে প্রভাব ফেলেছে।
শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে মাদ্রাসা, সাধারণ এবং ইংরেজি—এই তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিন ধরনের ভিন্ন মানসিকতা ও সংস্কৃতি তৈরি করছে। ফলে ছাত্ররা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে, তখন তাদের মধ্যে দেশপ্রেম বা ইতিহাসের একটি সাধারণ ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই বিভ্রান্তি দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ‘অগ্রসেনা’ (ভ্যানগার্ড) দলের প্রয়োজন ছিল, যারা সব মতের শিক্ষার্থীদের এক জাতীয় পতাকাতলে ও অভিন্ন ইতিহাস চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করতে পারত। ১৯৪৭ সাল থেকে আমরা একটি জাতি হয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও ইতিহাসের সেই ‘অচেতন শক্তি’কে আমরা আজও ধরতে পারিনি।
অধ্যাপক কামাল অর্থনৈতিক সংকটকেও এই বিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, দারিদ্র্য মানুষকে হীনম্মন্য করে তোলে এবং আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে দেয়। ঢাকা শহরের হঠাৎ জৌলুস ও বড় বড় প্রকল্পগুলো দেখে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ নিজেদের রাষ্ট্র থেকে বঞ্চিত মনে করতে শুরু করেছে। এই অবদমিত ক্ষোভ থেকেই তারা মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলোকে কেবল একটি দলের ক্ষমতার দম্ভ বা প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং তাতে আঘাত হানে। পুঁজিবাদের এই যুগে জাতীয়তাবাদ আজ সারা বিশ্বেই পদদলিত হচ্ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন ভাষা বা ধর্মের নামে আলাদা করার চেষ্টা চলছে (যেমন আরবি বিশ্ববিদ্যালয়), যা মোটেও কাম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র, যেখানে শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের প্রয়োজন নিয়ে ভাববে। অন্যদিকে, আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সংকট—অর্থাৎ আমরা বাঙালি না বাংলাদেশি—এই দ্বিধা আজও কাটেনি। রাজনৈতিক দলগুলোও আদর্শগত ঐক্যের চেয়ে ক্ষমতা ও ব্যবসাকে বড় করে দেখেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ও যারা এই লড়াইকে সমর্থন করেনি, তাদেরও একটি বৃহত্তর জাতীয় পতাকাতলে আনার মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব বর্তমানে অনুপস্থিত।
সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে একটি নির্দিষ্ট দলের একক অর্জন হিসেবে প্রমাণের যে চেষ্টা চলেছে, তা সাধারণ মানুষকে এই ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে আত্মগোপন করতে হয়েছে এবং পাঠ্যপুস্তকেও অনেকের অবদান আড়াল করা হয়েছে। ফলে বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের অনেক তথ্যই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলধারার লেখকরাও মুক্তিযুদ্ধকে একটি ‘জনযুদ্ধ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি বলে তিনি মনে করেন।
ইতিহাস কোনো স্থির চিত্র নয়, বরং এটি একটি বহমান প্রক্রিয়া। অধ্যাপক বেগম আকতার কামালের পর্যবেক্ষণ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ইতিহাসের বিকৃতি বা একপক্ষীয় উপস্থাপন দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্যের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে একটি জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে আমাদের ৫ হাজার বছরের বিবর্তিত সভ্যতার ইতিহাসকে ধারণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে কোনো সংকীর্ণ দলীয় বৃত্তে বন্দি না রেখে একে স্বচ্ছ ও অভিন্ন কাঠামোয় নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হবে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।