রাজশাহী বিভাগে হামের সংক্রমণ এবং আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর মিছিল জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ সেবার তীব্র সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে, যা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই নতুন করে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, হাম কেবল সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ নয়; এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া কিংবা মস্তিষ্কের প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শিশুর জীবন বাঁচাতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ (ICU) অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। শয্যা সংকটের কারণে অনেক মুমূর্ষু শিশুকে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে আইসিইউ, শিশুদের জন্য বিশেষায়িত আইসিইউ (PICU) এবং নবজাতকদের আইসিইউ (NICU) সেবার পরিধি বাড়লেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সমুদ্রের মাঝে শিশুবিন্দুর মতো। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে আইসিইউ সুবিধা রয়েছে মাত্র ১০০টির মতো হাসপাতালে, যার ৮০ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকারি পর্যায়ে কার্যকর শয্যার সংখ্যা মাত্র ২২০ থেকে ২৫০টি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইসিইউ ও সাধারণ শয্যার অনুপাত হওয়া উচিত ১:১০, কিন্তু বাংলাদেশে এই চিত্র ১:২১৯। অর্থাৎ প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য নিবিড় পরিচর্যা শয্যা রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক সাত (০.৭) শতাংশ।
করোনা মহামারির পর শয্যা সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও দক্ষ জনবলের অভাবে তার বড় অংশই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। একটি কার্যকর আইসিইউ পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (ইনটেনসিভিস্ট), অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট (অজ্ঞানকারী বিশেষজ্ঞ) এবং বিশেষায়িত নার্স প্রয়োজন। বর্তমানে সারা দেশে মাত্র ৪৩ জন নিবিড় পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ আইসিইউ চলছে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টদের ওপর ভর করে। নার্সিং সেবার ক্ষেত্রেও একই দৈন্যদশা; মাত্র ৪০ শতাংশ নার্স জীবন রক্ষাকারী প্রাথমিক চিকিৎসা বা কৃত্রিমভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস সচল করার (CPR) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
আইসিইউ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া। একটি ১০ শয্যার ইউনিট চালু করতেই প্রায় ২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনতে দীর্ঘ সময় লাগে। এছাড়া জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে উন্নত পরীক্ষাগার ও রোগ নির্ণয় সুবিধার অভাব আইসিইউ সেবাকে আরও অকার্যকর করে তুলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মোট রোগীর ৫ শতাংশের আইসিইউ প্রয়োজন হয় এবং সঠিক ব্যবস্থাপনায় মৃত্যুহার অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব। অথচ মাত্র ২০ শতাংশ হাসপাতালে কার্যকর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু আছে।
বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবার খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে হওয়ায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কেবল সরকারি হাসপাতালের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু সেখানে শয্যার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা অনেক সময় শিশুর অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শিশুদের মৃত্যু আমাদের জাতীয় ব্যর্থতারই নামান্তর। আইসিইউ কেবল একটি কক্ষ বা শয্যা নয়, এটি দক্ষ জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির এক সমন্বিত ব্যবস্থা। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কেবল শয্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই সেবা বিকেন্দ্রীকরণ (শহর থেকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া) করা জরুরি। অন্যথায়, প্রতিটি মহামারিতে আমাদের এভাবেই অসহায়ভাবে শিশুদের প্রাণ হারাতে দেখতে হবে। নীতিনির্ধারকদের এখনই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আইসিইউ সেবাকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা এবং এর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।