যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ড এলাকায় দুটি যাত্রীবাহী ট্রেনের মধ্যে ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এক ট্রেনচালক প্রাণ হারিয়েছেন এবং অন্তত ৮৯ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঘটা এই ভয়ংকর দুর্ঘটনাকে ‘বড় ধরনের দুর্ঘটনা’ বা মেজর ইনসিডেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ব্রিটিশ পরিবহন পুলিশ (বিটিপি)।
ইস্ট অব ইংল্যান্ড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আহতদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকরা তাদের জীবন বাঁচাতে লড়াই করছেন। এ ছাড়া ২২ জন যাত্রী গুরুতরভাবে জখম হয়েছেন এবং বাকি ৫৬ জন তুলনামূলকভাবে সামান্য আঘাত পেয়েছেন। খবর পাওয়ার পরপরই জরুরি সেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ শুরু করেন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের রেল, মেরিটাইম অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের (আরএমটি) সাধারণ সম্পাদক এডি ডেম্পসি এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এক আবেগঘন বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে, দুর্ঘটনায় নিহত ট্রেনচালক তাদের ইউনিয়নেরই একজন সাবেক প্রতিনিধি ছিলেন। তার এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো রেলওয়ে কর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে ট্রেনের সামনের বগিতে (ক্যারেজ) থাকা পিটার ন্যাপ নামের এক যাত্রী শিউরে ওঠেন। তিনি বলেন, “সংঘর্ষের প্রচণ্ড ধাক্কা সামলে আমি যখন কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালাম, দেখলাম চারদিকের আসনগুলো (সিট) উপড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। পুরো বিষয়টা আমার কাছে মনে হয়েছিল যেন কোনো শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছে। চারদিকে ধোঁয়া উড়ছিল, মানুষের মুখ রক্তাক্ত ছিল, অনেকের পা ভেঙে গেছে। আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম, পুলিশ যাত্রীদের তথ্য নিচ্ছে এবং অনেককে স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।”
নিজের জন্মদিন উদযাপনের উদ্দেশ্যে লন্ডনে যাচ্ছিলেন টেরেসা ইতাবোর নামের আরেক নারী যাত্রী। বিভীষিকাময় সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “বেডফোর্ড স্টেশন ছাড়ার পরপরই বিকট এক শব্দ হলো। কী ঘটছে, তা আমি বুঝে ওঠার আগেই আমার মাথা সামনের আসনে সজোরে আঘাত করে। আমি কিছুক্ষণের জন্য দিশেহারা হয়ে পড়ি। চোখ খুলে দেখি মেঝেতে মানুষ পড়ে আছে, আর চারদিকে কেবল রক্ত আর রক্ত।”
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরপরই ওই রুটের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই সেন্ট প্যানক্রাসগামী এবং সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া সব ধরনের ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের রেল কর্তৃপক্ষ ইস্ট মিডল্যান্ডস রেলওয়ে (ইএমআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, উদ্ধারকাজ ও রেললাইন মেরামতের জন্য শনিবারও এই রুটে ট্রেন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। যাত্রীদের বিকল্প পথ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সিগন্যাল (সংকেত) বিভ্রাট নাকি যান্ত্রিক ত্রুটি—ঠিক কী কারণে একই লাইনে দুটি ট্রেন চলে এল এবং এই প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ঘটল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।