যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টলেডো শহরে একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব চলাকালে ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝে পড়ে অন্তত ১২ জন সাধারণ মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
শনিবার (৬ জুন) টলেডোর ঐতিহাসিক জেলায় আয়োজিত বার্ষিক ‘ওল্ড ওয়েস্ট এন্ড’ উৎসবে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটে। টলেডোর ডেপুটি পুলিশ প্রধান জো হেফারনন জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে অন্তত দুজন বন্দুকধারী ছিল। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ওই দুই সশস্ত্র ব্যক্তি একে অপরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, তাদের ছোঁড়া এলোপাতাড়ি গুলির মাঝে পড়ে সাধারণ উৎসবে আসা দর্শনার্থীরা হতাহত হন। ঘটনার পর থেকে বন্দুকধারীরা পলাতক রয়েছে এবং তাদের গ্রেফতারে পুলিশি চিরুনি অভিযান চলছে।
ঐতিহাসিক এই জেলাটিতে সরাসরি সংগীত পরিবেশনা ও বাড়ি পরিদর্শন কর্মসূচির মতো জনপ্রিয় বার্ষিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, মুহুর্মুহু গুলির শব্দের মধ্যে আতঙ্কিত মানুষ প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করছেন এবং জরুরি বিভাগের কর্মীরা আহতদের উদ্ধার করছেন। আনন্দঘন একটি পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
কেভিন বেরি নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে বলেন, তিনি বন্ধুদের সঙ্গে উদ্যানের ভেতর বসে গান শুনছিলেন। হঠাৎ করেই বেশ কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পান তারা। কেভিন বলেন, গুলির শব্দ শোনামাত্রই সবাই মাটিতে শুয়ে পড়ে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে তিনি মাথা তুলে দেখেন একটি আগ্নেয়াস্ত্র মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে। উৎসবের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে কাজ করা এবং চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেভিন বেরি নিজেই আহতদের সাহায্যে এগিয়ে যান। তিনি ওই উদ্যানের বিভিন্ন জায়গায় অন্তত পাঁচজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রক্তাক্ত পড়ে থাকতে দেখেন এবং তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন।
‘ওল্ড ওয়েস্ট এন্ড’ হলো টলেডোর ঐতিহাসিক অঞ্চলের দুই দিনব্যাপী একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। যেখানে গান-বাজনা, খাবার বিক্রেতাদের সমাগম, ঐতিহাসিক বাড়ি প্রদর্শন এবং কেনাকাটার সুযোগ থাকে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ পরিবারসহ এই উৎসবে অংশ নেন। এবারের উৎসবটি এভাবে বিষাদে রূপ নেবে তা স্থানীয় বাসিন্দারা কেউই ভাবেননি।
শহরের নগর কাউন্সিল সদস্য থেরেসা মরিস দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এই ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দা এবং বছরের পর বছর ধরে এই উৎসবে আসা দর্শনার্থীদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এদিকে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের গভর্নর মাইক ডিওয়াইন এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, টলেডোর এই পরিস্থিতি তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। তিনি যোগ করেন, গ্রীষ্মকালীন এই উৎসবগুলো পরিবারের একসঙ্গে সময় কাটানোর নিরাপদ জায়গা হওয়া উচিত, সহিংসতার আতঙ্কের জায়গা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনবহুল স্থানে বন্দুক হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শপিং মল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা উন্মুক্ত উৎসবের মতো স্থানে যেখানে মানুষের নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি থাকার কথা, সেখানেই এখন অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যাচ্ছে। মার্কিন সমাজ ও রাজনীতিতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন আরও কঠোর করার দাবি বারবার উঠলেও আইনি শিথিলতার কারণে সাধারণ নাগরিকরা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকিতে পড়ছেন। এই ঘটনাটি আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবাধ অস্ত্র সংস্কৃতির ভয়ানক রূপটি বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।
একটি সামাজিক ও পারিবারিক উৎসব যেখানে আনন্দের বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে বন্দুকের গর্জন সভ্য সমাজের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। ওহাইওর এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার ফাটলকেই নির্দেশ করে না, বরং অবাধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কুফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা প্রমাণ করে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই হোক না কেন, উৎসবের মতো নিরাপদ প্রাঙ্গণগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এই ধরনের সহিংসতার অবসান ঘটাতে কেবল অপরাধীদের গ্রেপ্তারই নয়, বরং অস্ত্র সংস্কৃতির কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।