যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এখন এক বিধ্বংসী রূপ নিয়েছে। বুধবার রাতভর ইরানের দক্ষিণাঞ্চল, কৌশলগত হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন উপকূল এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে তেহরান। দুই পরাশক্তির এই পাল্টাপাল্টি হামলায় সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ভয়াবহ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, মার্কিন হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম—মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নিয়োজিত মার্কিন সামরিক শাখা) জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং হরমুজ প্রণালিতে সামরিক হুমকি তৈরি করা ইরানি সক্ষমতা ধ্বংস করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন নৌ অবরোধ ভেঙে অগ্রসর হতে চাওয়া একটি জাহাজকে অচল করে দেওয়ার দাবিও করেছে ওয়াশিংটন।
হামলা চলাকালীন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, সিরিক, চাবাহার, কোনারাক ও রাস্কসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হামলার পরপরই রাজধানী তেহরানসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।
এদিকে মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে পাল্টা প্রত্যাঘাত শুরু করেছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সফল হামলা চালিয়েছে। এছাড়া জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাডার এবং জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ইরানি বার্তা সংস্থা ফারসের তথ্যমতে, এটি তাদের ‘সায়েকেহ’ (বজ্রপাত) সামরিক অভিযানের নবম ধাপ। পাশাপাশি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি—ইরানের বিশেষায়িত সশস্ত্র বাহিনী) জানিয়েছে, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে তারা ‘নাসর-২’ অভিযানের আওতায় সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আন্দিমেস্ক শহরের আকাশে আমেরিকার একটি অত্যাধুনিক ‘এমকিউ-৯ রিপার’ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছে আইআরজিসি।
এই সংঘাতের ফলে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যে চুক্তি থেকে ইরানের কোনো বাস্তব সুবিধা আসে না, তা বজায় রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি দ্রুত আলোচনায় না ফেরে, তবে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের মতো বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও তীব্র হামলা চালানো হবে।
মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের পথ পরিবর্তন করেছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর জবাবে আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, এই অবরোধ প্রত্যাহার করা না হলে হরমুজ প্রণালির বাইরে মার্কিন মিত্রদের অন্যান্য তেল ও গ্যাস রপ্তানি রুটও (পরিবহন পথ) মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।