মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও কাটছে না সংঘাতের রেশ। ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন দেওয়ার পরও দেশটিতে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল, যা নতুন করে উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার খবর যখন বিশ্বজুড়ে কিছুটা স্বস্তি ছড়িয়েছিল, ঠিক তখনই ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। স্থানীয় নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরাইল’ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সত্ত্বেও ইসরাইলি বিমান বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলের দাবি, যুদ্ধবিরতি শুরুর নির্ধারিত সময়ের পরও ইরান তাদের দিকে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (শক্তিশালী পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র) নিক্ষেপ করেছে, যার পাল্টা জবাব হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
সংকট কেবল ইরান কেন্দ্রিক নয়, বরং এর ডালপালা ছড়িয়েছে লেবানন পর্যন্তও। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এখন পর্যন্ত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইল তাদের সামরিক অভিযান বা স্থল অভিযান বন্ধ করার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখায়নি। ফলে এই যুদ্ধবিরতি কতটুকু সর্বজনীন হবে, তা নিয়ে বড় ধরণের সংশয় তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতিকে নিজেদের বড় বিজয় হিসেবে দেখছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট এই সফলতার পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প ও দেশটির সামরিক বাহিনীকে। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঠিক রণকৌশলের কারণেই এই কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব হয়েছে। লেভিট আরও উল্লেখ করেছেন যে, ট্রাম্প ধারণা করেছিলেন এই যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হবে। মাত্র ৩৮ দিনের মাথায় মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের অধিকাংশ লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই ‘সাফল্য’ আলোচনার টেবিলে তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। এর ফলেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের মতো অনমনীয় শক্তির সঙ্গে কঠিন দর কষাকষি করে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পথ উন্মুক্ত করতে পেরেছেন। এমনকি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (যে সরু জলপথ দিয়ে খনিজ তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে) পুনরায় সচল করার বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছে, তারাও দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধের ময়দানে তারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করে ফেলেছে। এখন তারা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে রাজনৈতিক আলোচনায় বসতে আগ্রহী, যাতে যুদ্ধক্ষেত্রের এই সাফল্যকে কূটনৈতিকভাবে সুসংহত করা যায়। তবে যুদ্ধের ময়দানে পাল্টাপাল্টি হামলার খবর আসতে থাকায় এই আলোচনা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা দেখার বিষয়।
যুদ্ধবিরতি মানেই কি শান্তি? এই প্রশ্নের উত্তর এখন বড় বেশি ধূসর। একদিকে হোয়াইট হাউস যখন একে কূটনৈতিক বিজয় বলছে, অন্যদিকে রণক্ষেত্রে কামানের গর্জন আজও থামেনি। যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের এই যে সংস্কৃতি, তা কেবল আলোচনার টেবিলের বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট করে না, বরং সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট নিরসনে কেবল সাময়িক বিরতি নয়, বরং চাই সব পক্ষের মধ্যে আন্তরিক সমঝোতা। আলোচনার টেবিলে বসার আগে অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ না হলে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি হয়তো কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।