লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবারও রক্তাক্ত হামলায় মেতে উঠেছে ইসরাইলি বাহিনী। বুধবার দক্ষিণ লেবাননে চালানো এই পৈশাচিক ড্রোন হামলায় আল-আখবার পত্রিকার নারী সাংবাদিক আমাল খলিলসহ মোট ৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির বারতা নিয়ে আসা যুদ্ধবিরতির ১০ দিন পার হতে না হতেই আবারও লাশের মিছিলে ভারি হয়ে উঠেছে লেবাননের বাতাস। গত বুধবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি সেনাদের ড্রোন হামলায় একটি চলন্ত গাড়িতে থাকা দুই বেসামরিক নাগরিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এই নৃশংস ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরাইলি কামানের গোলার শিকার হন সংবাদকর্মীরাও। এতে প্রাণ হারান অভিজ্ঞ নারী সাংবাদিক আমাল খলিল। লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, আত-তাইরি শহরে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়।
মর্মান্তিক বিষয় হলো, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া আমাল খলিলকে উদ্ধারের চেষ্টা করার সময় ইসরাইলি বাহিনী দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায়। এতে জয়নাব ফারাজ নামে আরেকজন সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় তিবনিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর এই সুপরিকল্পিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেবাননের তথ্যমন্ত্রী পল মোরকোস। তিনি বিশ্ববাসীর কাছে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ইসরাইলি এই উস্কানিমূলক হামলার দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননের কানতারা এলাকায় ইসরাইলি সেনাবহর লক্ষ্য করে ড্রোন ও রকেট হামলা চালিয়েছে। এদিকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় লেবাননে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে বাণিজ্যিক বিমানে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। সংঘাতের এই নতুন মোড়ে ফ্রান্সও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে; কারণ গত সপ্তাহে ইসরাইলি হামলায় আহত হওয়া দুই ফরাসি শান্তিরক্ষী বুধবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
গত কয়েক মাসের এই অসম যুদ্ধে লেবাননে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৯০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৭৭ জন শিশু এবং ১০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। যদিও আন্তর্জাতিক চাপে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, কিন্তু সীমান্তের 'হলুদ রেখা' (ইসরাইলিদের নির্ধারিত সীমানা) নিয়ে উত্তজনা কমছে না। ঘরে ফিরতে চাওয়া সাধারণ মানুষ আকাশজুড়ে ড্রোনের বিকট শব্দ আর নতুন করে হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
যুদ্ধবিরতি যখন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন আমাল খলিলের মতো কলম যোদ্ধাদের রক্ত দিয়ে তার মূল্য দিতে হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও ইসরাইলের এই একগুঁয়েমি প্রমাণ করে যে, তারা কূটনীতির চেয়ে কামানের ভাষাতেই বেশি বিশ্বাসী। এই সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান নেই—জাতিসংঘের এই ধ্রুব সত্যটি যদি যুধ্যমান পক্ষগুলো দ্রুত না বোঝে, তবে লেবাননের মাটি আরও অসংখ্য নিষ্পাপ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হবে।