মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এমন কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখতে নাগরিকদের প্রতি এক অভিনব ও কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের ডাক দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আগামী এক বছর সোনা না কেনা এবং জ্বালানি বাঁচাতে বাসা থেকে দাপ্তরিক কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তে কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার ঢেউ আছড়ে পড়ে অন্য প্রান্তেও। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মূল্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এমন অবস্থায় আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই আসন্ন অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে আগেভাগেই নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রোববার (১০ মে) দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হায়দরাবাদে নিজ রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি দেশবাসীর প্রতি এই জরুরি আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা সঞ্চয় ধরে রাখার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোনা আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। তাই এই সংকটকালীন সময়ে নাগরিকদের স্বর্ণালংকার কেনা থেকে বিরত থাকার বিশেষ আরজি জানান তিনি। অতীতের উদাহরণ টেনে মোদী বলেন, "ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, একটা সময় ছিল যখন দেশের যেকোনো চরম সংকটে সাধারণ মানুষ তাদের জমানো সোনা অকাতরে দেশের জন্য দান করতেন। আজ সরকারের আপনাদের কাছ থেকে সোনা দান করার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের আজ এই সংকল্প নিতে হবে যে, আগামী এক বছর আমরা নতুন করে কোনো সোনা বা গহনা কিনব না। দেশের অর্থনীতির সুরক্ষায় এই ছোট চ্যালেঞ্জটুকু আমাদের গ্রহণ করতেই হবে।"
বিশ্ববাজারে পেট্রোলিয়াম জাতীয় জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দামের কথা উল্লেখ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন। তিনি করোনা মহামারির সেই অবরুদ্ধ সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দেশের সম্পদ বাঁচাতে আমাদের আবারও সেই পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যেতে হবে। যানজটে পুড়িয়ে ফেলা জ্বালানি বাঁচাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যতটুকু সম্ভব কর্মীদের বাসা থেকেই দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করার সুযোগ দিতে হবে।
এর পাশাপাশি, শারীরিক উপস্থিতির বদলে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দূরবর্তী বা দৃশ্যমান বৈঠকের (ভিডিও কনফারেন্স বা অনলাইন মিটিং) মাধ্যমে কাজ সেরে ফেলার প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে বা পরিহার করে সাধারণ যাত্রীবাহী গণপরিবহন ব্যবহারের পরামর্শ দেন মোদী। তার মতে, একটি দেশের নাগরিকরা প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করবেন, তা সরাসরি দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সমান। কারণ, জ্বালানি আমদানি কমানো গেলে দেশের কোষাগারে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
অর্থনৈতিক এই যুদ্ধ মোকাবিলার সর্বশেষ হাতিয়ার হিসেবে তিনি দেশীয় শিল্পের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর কথা বলেন। বিদেশের ওপর থেকে পরনির্ভরশীলতা চিরতরে কমিয়ে আনতে সাধারণ মানুষকে আবারও 'ভারতে তৈরি' বা সম্পূর্ণ দেশীয় পণ্য কেনার জন্য আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানান নরেন্দ্র মোদী। তিনি মনে করেন, নিজেদের উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল তার নিজ দেশের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশ্ব অর্থনীতি আজ এক সুতোর ওপর ঝুলছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে বিলাসিতা পরিহার করে সম্পদের সঠিক ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমিয়ে আনা এবং দেশীয় শিল্পের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোই হতে পারে আসন্ন বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে নাগরিকদের ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সচেতন হওয়ার যে বার্তা মোদী দিয়েছেন, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গভীরভাবে চিন্তার বিষয়।