যুদ্ধবিরতির আশায় প্রহর গুণতে থাকা লেবাননবাসীকে রক্তগঙ্গা আর ধ্বংসস্তূপ উপহার দিল ইসরাইলি বাহিনী। মাত্র দশ মিনিটের ভয়াবহ তণ্ডবে আড়াই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং শত শত স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি)।
লেবাননের আকাশে যখন শান্তির কপোত ওড়ানোর তোড়জোড় চলছিল, ঠিক তখনই নেমে এলো মৃত্যু আর বিভীষিকার কালো মেঘ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার মাঝপথেই বুধবার লেবাননজুড়ে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দশ মিনিটের এক প্রলয়ঙ্কারী অভিযানে হিজবুল্লাহর অন্তত ১০০টি স্থাপনা লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। তবে এই হামলার শিকার হয়েছেন মূলত সাধারণ মানুষ, যার ফলে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৪ জন নিরীহ নাগরিক।
এই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি। সংস্থাটি সরাসরি কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও তাদের বিবৃতিতে লেবাননের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে যে মৃত্যু এবং ধ্বংসের চিত্র ফুটে উঠেছে, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও রাগ প্রকাশ করেছে। লেবাননে নিযুক্ত রেড ক্রসের প্রতিনিধি এ্যাগনেস ধুর এক আবেগঘন বিবৃতিতে জানান, লেবাননের সাধারণ মানুষ বুক ভরা আশা নিয়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু আকস্মিক এই হামলা তাদের সেই স্বপ্নকে মুহূর্তে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যারা দীর্ঘদিন পর নিজের ভিটেমাটিতে ফেরার কথা ভাবছিলেন, তারা এখন রাজপথে এবং হাসপাতালের বারান্দায় প্রিয়জনদের লাশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। পুরো দেশটি এখন এক চরম আতঙ্ক ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড় এবং মানুষের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রেড ক্রস মনে করে, যুদ্ধের এই ভয়াবহতা লেবাননবাসীকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা শব্দটি এখন তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ইসরাইলি বাহিনীর এই ব্যাপক অভিযান এমন এক সময়ে ঘটল যখন আন্তর্জাতিক মহল লেবাননে স্থিতিশীলতা ফেরাতে তৎপর ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের এই ধ্বংসলীলা প্রমাণ করে দিল যে, ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য কতটা তুচ্ছ হতে পারে।
লেবাননের এই ট্র্যাজেডি বিশ্ববিবেকের কাছে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। যখন শান্তি আলোচনার টেবিলে নথিপত্র আদান-প্রদান হয়, ঠিক সেই মুহূর্তে রকেট আর বোমার বৃষ্টি কি শুধু কৌশলগত জয়, নাকি মানবতাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক নীল নকশা? যুদ্ধের এই লেলিহান শিখা যদি এখনই নেভানো না যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই জনপদ অচিরেই এক জনমানবহীন শ্মশানে পরিণত হবে। শান্তির পথ কি তবে রক্ত দিয়েই রঞ্জিত হতে হবে?