লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত বিমান হামলায় দুই নিষ্পাপ শিশুসহ অন্তত পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। একদিকে যখন আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধবিরতি নিয়ে জোর তৎপরতা চলছে, অন্যদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী স্থল অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়ায় পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাকর হয়ে উঠেছে।
লেবাননের আকাশ ও সীমান্ত এখন বারুদের গন্ধে ভারী। বুধবার দক্ষিণ লেবাননের সিডন জেলার আনসারিয়া শহরে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ-র তথ্যমতে, এই হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের ঘরবাড়ি লক্ষ্যবস্তু করায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। বৈরুত ও এর আশপাশের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত এই বোমাবর্ষণে লেবাননে মানবিক সংকট এখন চরমে।
গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত দুই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরাইলি সামরিক অভিযানের মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ। বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখন খোলা আকাশের নিচে অথবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে তাদের স্থল অভিযান থামবে না। এমনকি তিনি দাবি করেছেন, রণকৌশলের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ জাবেইল শহরটি দখলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তার সেনাবাহিনী। মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতেই নেতানিয়াহু এই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
তবে ইসরাইলি অগ্রযাত্রাকে সহজ হতে দিচ্ছে না সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। বুধবারও তারা সীমান্তে ব্যাপক পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। কিরিয়াত শহরে রকেট হামলাসহ জাবেইল এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর সাঁজোয়া যান ও বুলডোজারের ওপর হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। ইসরাইলি সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে যে, হিজবুল্লাহর এই আকস্মিক রকেট হামলায় তাদের বেশ কয়েকজন সেনা আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। রণক্ষেত্রে এই প্রতিরোধ ইসরাইলি বাহিনীর জন্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
কূটনৈতিক ফ্রন্টেও চলছে নানা নাটকীয়তা। গত ৭ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইসরাইল তা প্রত্যাখ্যান করে। গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসিতে লেবাননের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় বসলেও তেল আবিব (ইসরাইলের রাজধানী ও ক্ষমতার কেন্দ্র) কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে দেয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরাইলকে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হচ্ছে। ওয়াশিংটনের এই চাপের মুখে ইসরাইল এখন বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
লেবাননের এই সংঘাত কেবল দুটি পক্ষের লড়াই নয়, বরং এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। আলোচনার টেবিলে যখন শান্তির বাণী উচ্চারিত হচ্ছে, ঠিক তখনই শিশুদের নিথর দেহ স্তূপ হচ্ছে ধ্বংসস্তূপের নিচে। রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের জীবন আজ তুচ্ছ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এখনই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে এই লেলিহান শিখা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করতে পারে। শান্তি কি তবে কেবলই শক্তিশালী দেশগুলোর ইচ্ছাধীন কোনো খেলনা? এই প্রশ্ন আজ বিশ্ববিবেকের কাছে।