লেবাননে ইসরায়েলের নতুন সামরিক আগ্রাসনের কড়া জবাব দিল ইরান। প্রতিবাদস্বরূপ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ 'হরমুজ প্রণালি' বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী দেশটি। ইরানের দাবি, লেবাননে ইসরায়েলের এই সাম্প্রতিক হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের হওয়া চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর জেরেই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এই জলপথ দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ ও নৌযান চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিশেষ বিবৃতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর 'খাতাম-আল আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স' (কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ওই বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আপাতত কোনো ধরনের নৌযান চলাচল করতে দেওয়া হবে না। সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি কেবল শত্রুপক্ষের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে তাদের প্রথম ও প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া।
বিবৃতিতে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েলের প্রতি আরও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, যদি এই আগ্রাসন এবং চুক্তির লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে, তবে ইরান হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। শত্রুকে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য তেহরান আরও কঠোর পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করবে। এই ঘোষণার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে চরম যুদ্ধাবস্থা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি লাগতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ব্যাপক আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সমুদ্রপথটি বিশ্ব খনিজ তেলের বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম রুট হিসেবে পরিচিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশই এই অত্যন্ত সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে।
ফলে এই কৌশলগত পানিপথটি বন্ধ থাকার অর্থ হলো বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়া। জ্বালানি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খুব দ্রুত যদি এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। তেল পরিবহনে বাধা তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায়।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে এমনিতেই এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এবং তার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের এই হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন পুরো বিশ্বের নজর আন্তর্জাতিক মহলের দিকে। উদ্ভূত এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ সংকট নিরসনে কী ধরনের কার্যকর ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।