দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে অবশেষে আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস দিয়ে আগামীকাল রোববার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক শহরে দুই চিরবৈরী দেশের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত কারিগরি স্তরের (টেকনিক্যাল লেভেল) বৈঠক শুরু হতে যাচ্ছে। আজ শনিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দশকের পর দশক ধরে চলা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার যে শীতল ও বৈরী সম্পর্ক, এই কারিগরি বৈঠকের মধ্য দিয়ে তার বরফ গলতে পারে বলে জোরালো আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এই উদ্যোগকে বিশ্ব শান্তির পথে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং)-এর ধারাবাহিকতায় এই বৈঠক আয়োজিত হচ্ছে। আগামী ২১ জুন অনুষ্ঠেয় এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি একে অপরের মুখোমুখি হবেন।
এবারের আলোচনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত দিক হলো প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যস্থতা। এই কারিগরি আলোচনায় কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরাই থাকবেন না, বরং মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে সেখানে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন পাকিস্তান ও কাতারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কাতার এর আগেও বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রতিপক্ষগুলোর মধ্যে বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয়ে সফল মধ্যস্থতা করেছে। অন্যদিকে, প্রতিবেশী হিসেবে ইরানের সঙ্গে সীমান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের কারণে পাকিস্তানের উপস্থিতিও এই বৈঠকে এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
কূটনৈতিক মহল মনে করছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই বৈঠকটি অত্যন্ত যুগান্তকারী একটি ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে চরম উত্তেজনা এবং সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার অবসানে এই আলোচনা বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নানা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, কারিগরি স্তরের এই আলোচনা সেই সংকট সমাধানের পথ অনেকটাই প্রশস্ত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কারিগরি স্তরের এই বৈঠক যদি সফল হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট চুক্তির রূপরেখায় পৌঁছাতে পারে, তবে তা ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় আলোচনার শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। কাতার ও পাকিস্তানের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই বৈঠক সফল হলে তা কেবল ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এখন পুরো বিশ্বের নজর সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক শহরের দিকে, যেখান থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নতুন কোনো ইতিহাস রচিত হতে পারে।