দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ধকল পেরিয়ে বিশ্ববাজারে নতুন এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ার স্থলবেষ্টিত দেশ আফগানিস্তান। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশটির কৃষিভিত্তিক রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তাজা ফল ও শুকনো ফল রপ্তানিতে এক অভাবনীয় জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্মত আফগান কৃষিপণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
আফগানিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার ৫১৭ টন তাজা ফল বিদেশে রপ্তানি করেছে। রপ্তানিকৃত এসব ফলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ১৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। আফগান আপেল, ডালিম, এপ্রিকট (খুবানি), আঙুর, খরমুজ, তরমুজ ও ডুমুর অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, পাকিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে। দেশের কৃষিপণ্য টিকিয়ে রাখতে আফগান সরকার দেশজুড়ে আধুনিক হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) নির্মাণে ব্যাপক জোর দিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এ খাতে ৫ বছরের কর অব্যাহতি বা ট্যাক্স হলিডে (কর ছাড়) ঘোষণা করা হয়েছে।
আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশকে ডালিমের রাজধানী বলা হয়। ২০২৫ সালে এই অঞ্চল থেকে ডালিম রপ্তানি হয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৮৭০ টন, যা আগের বছরের মাত্র ৭ হাজার টনের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি। ডালিমের প্রধান বাজার হিসেবে মালয়েশিয়া, রাশিয়া, পাকিস্তান ও উজবেকিস্তান নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। এছাড়া দেশটিতে উৎপাদিত ফলের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো আঙুর। আফগানিস্তানের মোট ফল চাষের প্রায় ৪৮ শতাংশ জমিতেই কেবল আঙুর উৎপাদিত হয়।
তাজা ফলের পাশাপাশি আফগান শুকনো ফলের চাহিদাও বৈশ্বিক বাজারে ব্যাপকভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার টন শুকনো ফল রপ্তানি করে ৬৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার আয় করেছে। কিশমিশ, বাদাম, পেস্তা ও পাইন নাট (এক প্রকার পাইন গাছের বীজ) রপ্তানি থেকে আফগান ব্যবসায়ীদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
হেরাত চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট (হেরাত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কক্ষ) জানিয়েছে, শুধু ২০২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসেই ৩ হাজার ১৪০ মেট্রিক টন শুকনো ফল রপ্তানি হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৭৬ লাখ ডলার। পূর্বে আফগানিস্তান থেকে শুকনো ফল বস্তায় ভরে পাঠানো হতো এবং তা অন্য দেশে নিয়ে পুনরায় প্যাকেটজাত করা হতো। তবে বর্তমানে হেরাতের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দেশেই প্যাকেজিং (পণ্য প্যাকেটজাতকরণ) ও ব্র্যান্ডিং (পণ্য পরিচিতি) করছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আফগান শুকনো ফলের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২৪ সালের প্রধান রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আফগানিস্তানের প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে ছিল কাঁচা তুলা, আঙুর, উষ্ণমণ্ডলীয় ফল ও বিভিন্ন ধরনের বাদাম। ঐতিহাসিকভাবে আফগান ফলের প্রধান ক্রেতা ভারত ও পাকিস্তান হলেও বর্তমান সময়ে নতুন বাণিজ্য সংযোগের সুবাদে উজবেকিস্তান, চীন, জার্মানি, কাজাখস্তান, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে আফগান ফলের বিশাল বাজার গড়ে উঠছে। চার ঋতুর বৈচিত্র্যময় আবহাওয়ায় সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় আফগান ফল বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে চলেছে।