কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বিতর্কিত ছবি এবং ধর্মগুরু পোপের বিরুদ্ধে করা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের জেরে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। পরিস্থিতির চাপে শেষ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে যিশুর আদলে নিজের সেই ছবি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে এখন উত্তাল আন্তর্জাতিক রাজনীতি। সম্প্রতি নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি ছবি পোস্ট করে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মেধা) দিয়ে তৈরি সেই ছবিতে ট্রাম্পকে অনেকটা যিশু খ্রিস্টের মতো পোশাকে দেখা যায়। ছবিতে তিনি এক ব্যক্তির মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করছেন বা তাকে রোগমুক্ত করছেন—এমন একটি স্বর্গীয় আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। গত রবিবার ছবিটি পোস্ট করার পরপরই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীসহ বিশ্বজুড়ে রক্ষণশীল নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। চাপের মুখে সোমবার ছবিটি সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হন ট্রাম্প।
বিতর্কের এখানেই শেষ নয়। ছবি পোস্ট করার আগে তিনি বর্তমান পোপ চতুর্দশ লিও-র বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক বার্তা দেন। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, পোপ অপরাধ দমনে অত্যন্ত দুর্বল এবং তার বৈদেশিক নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘জঘন্য’। একজন রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে খোদ পোপের ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে এমন সরাসরি আক্রমণ আধুনিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারে বিরল। পরবর্তীতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প আত্মপক্ষ সমর্থনের অদ্ভুত এক চেষ্টা চালান। তিনি দাবি করেন, ছবিটি পোস্ট করলেও তিনি মূলত নিজেকে একজন চিকিৎসক হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, লাল কুশ (রেড ক্রস—আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা) কর্মীদের মতো সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় তাকে দেখানো হয়েছিল এবং তিনি কেবল সেই সেবামূলক সংস্থাকে সমর্থন জানাতেই এটি করেছিলেন।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের বিপরীতে পোপ লিও অত্যন্ত সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বর্তমানে তিনি আফ্রিকান দেশগুলোতে ১১ দিনের এক সফরে রয়েছেন। আলজেরিয়া যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের তিনি জানান, ট্রাম্পের সাথে তিনি কোনো ব্যক্তিগত বিতর্কে জড়াতে চান না। প্রথম মার্কিন বংশোদ্ভূত পোপ হিসেবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, তার প্রধান কাজ যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং শান্তি ও সংলাপে উৎসাহ দেওয়া। তিনি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বহুপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই আচরণ তার ভোটারদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে। একদিকে পোপের শান্তি রক্ষার আহ্বান, অন্যদিকে ট্রাম্পের উগ্র রক্ষণশীল ও আক্রমণাত্মক মনোভাব—দুই মেরুর এই লড়াই এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ন্যাটোর (উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট) সহায়তা না পাওয়ার জেরে ব্যয় কমানোর যে ইঙ্গিত ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তার রেশ কাটতে না কাটতেই এই ধর্মীয় বিতর্ক তার ভাবমূর্তিকে নতুন করে সংকটের মুখে ফেলেছে। পশ্চিমা বিশ্বে পোপের অবস্থান অত্যন্ত শ্রদ্ধার, সেখানে ট্রাম্পের এমন ‘যিশু’ সাজার চেষ্টা এবং ধর্মগুরুকে তুচ্ছজ্ঞান করাকে অনেক সাধারণ নাগরিকও সহজভাবে নিচ্ছেন না।
একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যখন ধর্মীয় অনুভূতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক নয় বরং সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হয়ে ওঠে। ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ড কি কেবলই সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার কৌশল, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে? পোপের সংযত আচরণ এবং ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, শক্তি প্রয়োগের চেয়ে শান্তির ভাষা কত বেশি শক্তিশালী হতে পারে।