ইউরোপের রাজনীতিতে বড় ধরনের পটপরিবর্তন ঘটিয়ে হাঙ্গেরির দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্ষমতার মসনদ থেকে বিদায় নিলেন ভিক্টর অরবান। রোববারের নির্বাচনে দেশটির বিরোধী নেতা পিটার ম্যাগিয়ার এক ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন, যা হাঙ্গেরি তথা গোটা ইউরোপীয় রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করল।
হাঙ্গেরির সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের কট্টরপন্থী শাসনের পতন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার দেওয়া তথ্যমতে, প্রায় ৯৮ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, বিরোধী নেতা পিটার ম্যাগিয়ারের দল ‘তিসজা’ মোট ভোটের ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ পেয়েছে। অন্যদিকে, অরবানের দল ‘ফিদেজ’ পেয়েছে মাত্র ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে হাঙ্গেরির ভোটাররা স্পষ্টভাবেই পরিবর্তনের পক্ষে তাদের রায় দিয়েছেন।
দেশটির পার্লামেন্টের মোট ১৯৯টি আসনের মধ্যে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পিটার ম্যাগিয়ারের দল প্রায় ১৩৮টি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে। এই বিশাল জয় দেশটিতে সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করছে। এর ফলে নতুন সরকারের জন্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে বড় ধরনের সংস্কার আনা সহজ হবে। ভিক্টর অরবান ইতিমধ্যেই তার পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন এবং বিজয়ী নেতা ম্যাগিয়ারকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
রোববার (১২ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় পিটার ম্যাগিয়ার নিজেই প্রধানমন্ত্রী অরবানের কাছ থেকে অভিনন্দন পাওয়ার কথা জানান। জয়ের পর রাজধানী বুদাপেস্টের দানিউব নদীর তীরে হাজার হাজার উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ম্যাগিয়ার বলেন, আজ রাতে মিথ্যার ওপর সত্যের জয় হয়েছে এবং ভোটাররা হাঙ্গেরির ইতিহাসে এক নতুন পাতা যুক্ত করেছেন। তিনি দেশপ্রেমের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, হাঙ্গেরির মানুষ তাদের মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব পালন করেছে এবং ব্যালটের মাধ্যমে তার সঠিক উত্তর দিয়েছে।
ভিক্টর অরবানের এই পরাজয়কে কেবল হাঙ্গেরির অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত অরবানের বিদায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে অরবানের শাসন হাঙ্গেরির সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছিল এবং মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছিল।
নতুন সরকার গঠনের পর পিটার ম্যাগিয়ারের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। একই সঙ্গে গত দেড় দশকে গড়ে ওঠা রাশিয়ার প্রভাব কাটিয়ে ওঠা এবং গণতন্ত্রকে পুনরায় সুসংহত করা হবে নতুন প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য। বিশ্লেষকদের মতে, হাঙ্গেরির এই পটপরিবর্তন পুরো মহাদেশের উদারপন্থী রাজনীতির জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা।
হাঙ্গেরির এই নির্বাচন প্রমাণ করে যে, দীর্ঘস্থায়ী শাসন বা শক্তিশালী মিত্রদের সমর্থনই শেষ কথা নয়; বরং জনআকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনই রাজনীতির প্রকৃত নিয়ন্তা। ভিক্টর অরবানের পতনের মধ্য দিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে উগ্র জাতীয়তাবাদের যে ধারাটি শক্তিশালী হচ্ছিল, তাতে একটি বড় ধাক্কা লাগল। নতুন নেতার অধীনে হাঙ্গেরি কতটা স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক আদর্শ বজায় রাখতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।