বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নিজস্ব কৌশল বা পদ্ধতি তৈরি করেছে ইরান। শীঘ্রই এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে যাচ্ছে দেশটি, যা আন্তর্জাতিক শিপিং বা জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শনিবার ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি এক ঘোষণার মাধ্যমে এই নতুন পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন। তার ভাষ্যমতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থাপনা চালু করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থার আওতায় ইরান নির্দিষ্ট কিছু জাহাজকে বিশেষ সেবা প্রদান করবে এবং এর বিপরীতে জাহাজগুলো থেকে নির্দিষ্ট হারে শুল্ক বা ফি আদায় করা হবে।
ইরানের এই পরিকল্পনার সুফল কেবল সেই সব বাণিজ্যিক জাহাজ ও পক্ষগুলো পাবে, যারা তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রেখে চলবে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপটি মূলত ইরানের জলসীমায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলী অবস্থান। এর মাধ্যমে ইরান যেমন নিজেদের সামুদ্রিক সক্ষমতা জাহির করছে, তেমনি কৌশলগত এই জলপথের ওপর নিজস্ব কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে চাইছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধানতম রগ হিসেবে পরিচিত। এখান দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে বেশ কয়েকবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই ধরনের ফি আদায়ের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, যদি কোনো শিপিং কোম্পানি ইরানকে এ ধরনের শুল্ক প্রদান করে, তবে তাদের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের প্রভাব পড়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটিতে। প্রায় আড়াই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিজস্ব জাহাজ ছাড়া অন্য সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। যদিও গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র বোমাবর্ষণ সাময়িক স্থগিত করেছে, তবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর এখনো কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রেখেছে ওয়াশিংটন।
ইরানের বর্তমান এই নতুন পদ্ধতি চালুর ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি করেছে। যদি ইরান সত্যিই এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য বাধ্যতামূলক শুল্ক আরোপ করে, তবে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এটি একটি নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একদিকে মার্কিন অবরোধ, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, এটি একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক চাল। বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত এই জলপথটিতে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বা শুল্ক আদায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। সংঘাত আর উত্তেজনার এই বৃত্তে জ্বালানি সংকটের মতো জটিল পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে এই অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে বিশ্ববাজারের জ্বালানি নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদী হুমকির মুখে পড়তে পারে।