মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালির দিকে অগ্রসর হওয়া একটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি (LPG) ট্যাংকারে জোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির (IRIB) দেওয়া তথ্য মতে, সন্দেহবশত ভুল করে চালানো এই হামলায় জাহাজটির অন্তত দুই নাবিক নিহত হয়েছেন। আক্রমণের ফলে ইঞ্জিন কক্ষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জ্বালানিবাহী ট্যাংকারটি সমুদ্রের মাঝপথে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। মার্কিন বাহিনী প্রাথমিক ধারণা করেছিল যে জাহাজটি বেআইনিভাবে ইরানের উৎপাদিত গ্যাস পরিবহন করছিল, আর সেই ধারণা থেকেই এই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, শুক্রবার বিকেলে ওমান সাগরের জলসীমা থেকে কৌশলগত হরমুজ প্রণালির দিকে যাওয়ার সময় মোজাম্বিকের পতাকাবাহী ‘দিশা’ নামের ওই ট্যাংকারটিকে লক্ষ্য করে হামলাটি চালানো হয়। আক্রান্ত এই বাণিজ্যিক জাহাজটিতে মোট ২৮ জন ভারতীয় নাগরিক নাবিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ঘটনার পরপরই ইরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (X) প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, জাহাজে থাকা সব ভারতীয় নাবিক এখন পর্যন্ত নিরাপদ রয়েছেন এবং তাদের বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দূতাবাসের পক্ষ থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। তবে ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে যে দুজন নাবিকের প্রাণহানির কথা বলা হয়েছে, তাদের পরিচয় বা জাতীয়তা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে এখনও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, এই চাঞ্চল্যকর সামরিক আক্রমণের বিষযে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর বা তাদের সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক আকস্মিক ঘোষণায় জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্বে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউতে (MoU) উল্লেখিত দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি আর কার্যকর থাকছে না। ট্রাম্পের ওই ঘোষণার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও জলসীমায় উভয় দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে চরম থমথমে পরিস্থিতি ও মুখোমুখি পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। এই অস্থিরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির ওপর, যা বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের মূল আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও ভৌগোলিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ এখন পূর্ণাঙ্গ সামরিক রূপ নিয়েছে। ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন বিমান বাহিনীর সাম্প্রতিক নতুন দফার বিমান হামলায় অন্তত ৫৯ জন নাগরিক নিহত এবং আরও ৫৯২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দেশটির মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা হোসেইন কারমানপুরের বরাতে এই হতাহতের তথ্য প্রকাশ করা হয়। সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ এবং ভূখণ্ডে অব্যাহত এই বিমান হামলার কারণে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন এক ভয়াবহ সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।