তেহরান: বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আর কখনোই যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকেই এর সম্পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের হাতে। সুইজারল্যান্ডে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠকের পর এমনটাই জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার (সংসদ সভাপতি) ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। মঙ্গলবার (২৩ জুন) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা গালিবাফের এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
এর আগে সোমবার (২২ জুন) সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র বুর্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা হ্রাস এবং লেবানন সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সম্মত হয় ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কাতার ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খোলা রাখার ব্যাপারে দুই দেশ একমত হয়েছে।
সফর শেষে দেশে ফেরার পথে গালিবাফ তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামের ভিডিও বার্তায় এই সফরকে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সুইজারল্যান্ড সফরে আমাদের ভালো অর্জন হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, লেবানন সংকট নিরসন, ইরানের ওপর থেকে তেলের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিদেশে আটকে থাকা অর্থ বা জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে।’
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট (উপ-রাষ্ট্রপতি) জেডি ভ্যান্স জানান, তেহরান পুনরায় জাতিসংঘের পারমাণবিক পরিদর্শক দলকে ইরানে কাজ করার অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের তেলের ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এই চুক্তির আওতায় ইরান যেমন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা স্বস্তি পাবে, তেমনি তাদের দীর্ঘদিনের জব্দ থাকা আন্তর্জাতিক সম্পদও ফিরে পাবে।
তবে এখনই সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত হতে রাজি নন গালিবাফ। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আমরা কেবল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরুতে আছি। শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রাখতে হবে।’ ইরান ফেরার পথে গালিবাফ ওমানেও একটি সংক্ষিপ্ত কূটনৈতিক সফর করেন, যা হরমুজ প্রণালির পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে নৌপথটি খুলে দেওয়া হলেও, লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রতিবাদে গত শনিবার (২০ জুন) ইরান পুনরায় এই সামুদ্রিক পথটি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশ পুনরায় আলোচনায় বসে। ভুল বোঝাবুঝি ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ এড়াতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি সরাসরি যোগাযোগ চ্যানেল (যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট মাধ্যম) প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয় উভয় পক্ষ। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সমঝোতার পর সোমবার থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল আগের তুলনায় আরও দ্রুত ও নিরাপদ গতিতে শুরু হয়েছে।