যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে আশা জেগেছিল, তা তিনদিন পার হতে না হতেই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন করে বিমান হামলার জেরে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে সব ধরনের নৌযান ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। এই আকস্মিক পদক্ষেপের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এবার এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামনে দুটি কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে তেহরান। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’র রোববার (২১ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে চুক্তির আলোচনা প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণ বন্ধ করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। এছাড়া ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী কোনোভাবেই খুলে দেওয়া হবে না।
যখন হরমুজ প্রণালী বন্ধ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমন এবং একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের পক্ষ থেকে রোববার জানানো হয়েছে, সুইজারল্যান্ডের ‘লেক লুসার্ন’-এ একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠক শুরু হয়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া এই শীর্ষ বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ দুটির উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। কাতার আশা করছে, এই বহুপাক্ষিক আলোচনা একটি ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির পথ সুগম করবে।
অপরদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘আইআরআইবি’ (ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং) জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডে বর্তমানে ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হলো লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে অবরুদ্ধ বা জব্দ থাকা ইরানের রাষ্ট্রীয় আর্থিক সম্পদগুলো সচল করা। চুক্তি সচল রাখার স্বার্থে তেহরান তাদের অবরুদ্ধ অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবিটিকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল (জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক পরিমাপক) তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই রুট দিয়ে বিভিন্ন দেশে যায়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রণালী বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তীব্র সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা ডেকে আনতে পারে।