যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় লন্ডভন্ড হওয়া অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল অংকের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইরান। তেহরানের অভিযোগ, এই অঞ্চলে তাদের ওপর হামলা চালাতে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিয়ে অপরাধের অংশীদার হয়েছে প্রতিবেশী পাঁচটি দেশ।
সম্প্রতি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রলয়ঙ্করী প্রভাব এখন ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামোয় দৃশ্যমান। গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) জাতিসংঘে নিযুক্ত তেহরানের প্রতিনিধি অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়েছেন যে, ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যে পাঁচটি দেশ তাদের ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল, তাদের অবশ্যই এই ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভার নিতে হবে। ইরান মনে করে, এই দেশগুলোর পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এত বড় আকারের ক্ষতি করা সম্ভব ছিল না।
ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে ইরান এক অভিনব প্রস্তাব সামনে এনেছে। তারা ‘হরমুজ প্রণালী প্রটোকল’ (বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নীতিমালা) চালুর কথা বলছে। এই পরিকল্পনার আওতায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর বিশেষ কর আরোপ করে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ তোলার কথা ভাবছে দেশটি। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যবর্তী এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি রাশিয়ার একটি সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটির প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি হয়েছে। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি গত সপ্তাহে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনায় উত্থাপন করা হয়েছে। আগামীতে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বৈঠকেও ইরান এই ক্ষতিপূরণের দাবিতে অনড় থাকবে বলে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন।
ইরানের সামরিক স্থাপনা ছাড়াও তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র, পেট্রোকেমিক্যাল কারখানা, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে দফায় দফায় হামলা চালানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও কলকারখানাগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। যুদ্ধের ভয়াবহতা এতটাই যে, সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি পুনর্নির্মাণ করার মতো আর্থিক সামর্থ্যও বর্তমান সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন মোহাজেরানি।
বেসামরিক বিমান চলাচল খাতেও নেমে এসেছে বিপর্যয়। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, প্রায় ৬০টি যাত্রীবাহী বিমান অচল হয়ে পড়েছে, যার মধ্যে ২০টি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বিমান সংস্থাগুলোর দাবি, ফার্সি নববর্ষের (নওরোজ) ছুটির মৌসুমে তারা কোনো আয় করতে পারেনি, বরং গত ৪০ দিনে তাদের ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ ট্রিলিয়ন রিয়াল (ইরানি মুদ্রা) ছাড়িয়ে গেছে। তেহরান ও তাবরিজসহ প্রধান শহরগুলোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষগুলো (কন্ট্রোল টাওয়ার) বোমাবর্ষণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের দামামা বাজলে তার প্রতিধ্বনি যে কত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, ইরান তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ২৭০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল এই দাবি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক চালও হতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের ওপর কর আরোপের বিষয়টি বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়িয়ে দিতে পারে, যা প্রকারান্তরে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকেই এক অস্থিরতার মুখে ঠেলে দেবে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি এখন আলোচনার টেবিলে নাকি রণক্ষেত্রে—তা সময়ই বলে দেবে।