দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর ইসরায়েল ও লেবাননের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে ঐতিহাসিক এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত রাজনীতিতে নতুন এক আশার আলো দেখালেও সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এখনো থামেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৩৪ বছর পর ইসরায়েল ও লেবাননের শীর্ষ নেতারা সরাসরি আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন। বুধবার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ট্রাম্পের মতে, দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান উত্তেজনা প্রশমন এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতেই এই আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক বৈঠকটি আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, এর সুনির্দিষ্ট স্থান বা সময় সম্পর্কে হোয়াইট হাউজ (যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও বাসস্থান) থেকে এখন পর্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কয়েক দশকের বৈরিতা কাটিয়ে দুই দেশের নেতাদের মুখোমুখি বসা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে। তবে এই আলোচনার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাত।
গত কয়েক দিনে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত প্রথম দফার আলোচনা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। তবে হাল ছাড়েনি মধ্যস্থতাকারীরা। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য সব পক্ষ আবার বসতে পারে। ইরানের সাথে উত্তেজনার পারদ কিছুটা নামলে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার আলোচনায় বাড়তি গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই রণক্ষেত্রে পরিস্থিতি মোটেও শান্ত নয়। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তারা ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে অন্তত ৩৯টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় বসতি, সেনাবাহিনীর সমাবেশ এবং সামরিক যান লক্ষ্য করে ব্যাপক রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। দক্ষিণ লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থানের ওপর এই আক্রমণ চালানো হয় বলে গোষ্ঠীটি জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহর এই সাঁড়াশি আক্রমণের বিষয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে সীমান্তে উত্তেজনার এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ঘোষিত বৈঠকটি সফল হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়ে গেছে। একদিকে আলোচনার টেবিল তৈরি হওয়া এবং অন্যদিকে সীমান্তে মুহুর্মুহু রকেট হামলা—এই দুই বিপরীতমুখী চিত্রই এখন মধ্যপ্রাচ্যের প্রকৃত বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলছে।
দীর্ঘ ৩৪ বছর পর আলোচনার টেবিলে বসার এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানালেও যুদ্ধের ময়দান এখনো উত্তপ্ত। কূটনৈতিক টেবিলে শান্তির বাণী আর সীমান্তে কামানের গর্জন যখন একসাথে চলে, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—এই আলোচনা কি কেবলই কালক্ষেপণ নাকি সত্যিই কোনো স্থায়ী সমাধান? ইসরায়েল ও লেবাননের এই ঐতিহাসিক বৈঠক যদি সফল হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় হিসেবে গণ্য হবে। তবে তার আগে সীমান্তের আগ্নেয়াস্ত্রগুলো শান্ত হওয়া জরুরি।