আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পার্বত্য অঞ্চলে আঘাত হানা এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার এক বিশাল জনপদ। শুক্রবারের এই আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে রাজধানী কাবুলে একটি বসতবাড়ি ধসে পড়ে অন্তত আটজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং একটি শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। কম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে আফগানিস্তানের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিবেশী পাকিস্তান ও ভারতের রাজধানীও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
আফগানিস্তানের রুক্ষ পাহাড়বেষ্টিত জনপদে আবারও নেমে এল প্রকৃতির রুদ্র রোষের বিষাদের ছায়া। জার্মানির ভূ-বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র (জিএফজেড) জানিয়েছে, শুক্রবার আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালা অঞ্চলে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৯ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭৭ কিলোমিটার গভীরে। সাধারণত মাটির অনেক গভীরে কম্পনের উৎপত্তি হলে তার প্রভাব অনেক বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রমাণ মিলেছে এই ভূমিকম্পের ক্ষেত্রেও।
রাজধানী কাবুলে এই কম্পনের তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ভূমিকম্প চলাকালীন একটি পুরনো ও দুর্বল কাঠামোর বাড়ি তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে। এই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই আটজন দুর্ভাগা মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একটি শিশুকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা নতুন করে বড় ধরনের কম্পনের আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।
ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি কেবল আফগানিস্তানের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এবং ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতেও বেশ কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে। দিল্লির বহুতল ভবনগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে ঘরের আসবাবপত্র দুলতে শুরু করলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। জনবহুল শহরগুলোতে এমন কম্পন বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করলেও ওইসব এলাকা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে আফগানিস্তান বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। উঁচুনীচু পাহাড় আর বন্ধুর ভূখণ্ডে ঘেরা এই দেশটি প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে ভূমিকম্প এখানে এক দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী দুর্যোগ হিসেবে পরিচিত। পরিসংখ্যান বলছে, আফগানিস্তানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫৬০ জন মানুষ কেবল ভূমিকম্পের কারণে প্রাণ হারান। ভঙ্গুর অবকাঠামো, আধুনিক ভবন নির্মাণ কৌশলের অভাব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা পৌঁছাতে না পারার কারণে এই প্রাণহানির সংখ্যা অনেক সময় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
এর আগেও গত বছরের নভেম্বর মাসে দেশটি এমনই এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। সে সময় রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে অন্তত ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং অসংখ্য ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন করে এই ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সংকটের মুখে ঠেলে দিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে যখন মানুষ নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে, তখন বারবার এমন প্রাকৃতিক আঘাত তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
প্রকৃতির এই চরম সত্যের সামনে মানুষ কতোটা অসহায়, আফগানিস্তানের এই ঘটনা যেন আবারও আমাদের সামনে সেই প্রশ্ন তুলে ধরেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই ভূমিকম্প একটি বড় সতর্কবার্তা। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দুর্বল নির্মাণশৈলীর কারণে বারবার আমাদের জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন না করলে এমন অমূল্য প্রাণ হারানো হয়তো আমরা কোনোভাবেই থামাতে পারব না। এই বিপদে আফগান জনগণের পাশে দাঁড়ানো এখন বৈশ্বিক মানবিকতার এক বড় পরীক্ষা।