বিশ্ব রাজনীতির এক উত্তাল সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের উদ্দেশ্য করে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল খোলা চিঠি লিখেছেন ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার কয়েক দশকের বৈরিতার মাঝে এই চিঠিতে তিনি দাবি করেছেন, ইরান কোনো জাতির সঙ্গেই শত্রুতা পোষণ করে না এবং যুদ্ধের পথ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্যই বিপর্যয় বয়ে আনে।
গত বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম 'প্রেস টিভি' এই বিশেষ চিঠিটি প্রকাশ করে, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা 'রয়টার্স' বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের দামামা বাজছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই সরাসরি আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর এই কৌশলগত উদ্যোগ নিলেন পেজেশকিয়ান।
চিঠিতে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, আন্তর্জাতিক মহলে ইরানকে একটি 'হুমকি' হিসেবে চিত্রায়িত করার যে নিরন্তর চেষ্টা চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর ভাষায়, এটি কেবল বর্তমান সময়ের দৃশ্যমান সত্যের বিপরীত নয়, বরং ইতিহাসের সঙ্গেও এর কোনো সামঞ্জস্য নেই। তিনি মার্কিনিদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা নিজেদের সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলে—কেন ইরানকে বারবার শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে?
ইরানের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে পেজেশকিয়ান দাবি করেন, আধুনিক ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যাবে ইরান কখনোই কোনো দেশ আক্রমণ করেনি। দেশটির নীতিতে কখনোই আগ্রাসন (অন্যের ভূখণ্ডে বিনা উসকানিতে হামলা), সম্প্রসারণবাদ (নিজেদের সীমানা বৃদ্ধির লালসা), ঔপনিবেশিকতা (অন্য রাষ্ট্রকে পরাধীন করা) কিংবা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর জবরদস্তিমূলক কর্তৃত্ব ফলানোর নজির নেই। তিনি বলেন, ইরান সবসময়ই নিজের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চেয়েছে, কিন্তু অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেনি।
সাধারণ মার্কিনিদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা দিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, "ইরানিদের মনে অন্য কোনো দেশের মানুষের প্রতি কোনো ঘৃণা বা বিদ্বেষ নেই, এমনকি আমেরিকার সাধারণ জনগণের প্রতিও নয়।" পেজেশকিয়ানের মতে, ইরানকে একটি ভীতি বা হুমকি হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা আসলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতাধর মহলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার একটি হাতিয়ার মাত্র। তিনি সরাসরি সাধারণ আমেরিকানদের বিবেককে নাড়া দিয়ে প্রশ্ন করেন, "এই যুদ্ধের উন্মাদনা আমেরিকান জনগণের ঠিক কোন মৌলিক স্বার্থটি পূরণ করছে?"
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তাঁর চিঠিতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় ত্রুটি নির্দেশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, আমেরিকা বর্তমানে ইসরায়েলের হয়ে একটি 'ছায়া যুদ্ধে' (এমন এক যুদ্ধ যেখানে কোনো রাষ্ট্র সরাসরি অংশ না নিয়ে অন্য কোনো পক্ষকে দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করে) লিপ্ত হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, মার্কিন প্রশাসন মূলত জায়নবাদী (ইসরায়েলি আদর্শের অনুসারী) নীতিনির্ধারকদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ও পরিচালিত হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, আমেরিকা কি আদতে ইসরায়েলের প্রক্সি (প্রতিনিধি) হিসেবেই ইরানের সঙ্গে এই অহেতুক সংঘাতের পথে পা বাড়াচ্ছে না?
চিঠির শেষ অংশে যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা এবং একের পর এক সামরিক পদক্ষেপ কেবল ওই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ও সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগই বাড়িয়ে দেবে। তিনি মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সংঘাতের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং এটি কোনো পক্ষের জন্যই কোনো সুফল বয়ে আনবে না। যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমেই কেবল দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব।
ইরানের প্রেসিডেন্টের এই খোলা চিঠিটি কেবল একটি রাজনৈতিক বয়ান নয়, বরং এটি পশ্চিমা বিশ্বের জনমতকে সরাসরি প্রভাবিত করার একটি গভীর কূটনৈতিক চাল। যখন যুদ্ধের সম্ভাবনা তুঙ্গে থাকে, তখন রাষ্ট্রনায়করা সাধারণত অন্য রাষ্ট্রের প্রধানদের সাথে যোগাযোগ করেন, কিন্তু পেজেশকিয়ান বেছে নিয়েছেন সাধারণ জনগণকে। এটি প্রমাণ করে যে, তেহরান বোঝাতে চাইছে যুদ্ধের পেছনে সাধারণ মানুষের কোনো সায় নেই, বরং এটি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফসল। বিশ্ববাসীকে এখন নতুন করে ভাবতে হবে—অস্ত্রের ঝনঝনানি কি সত্যিই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, নাকি আলোচনার টেবিলই রক্তক্ষয় বন্ধের একমাত্র পথ? সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন মার্কিন নাগরিকদেরই খুঁজতে হবে।