আজ ২ এপ্রিল, বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। অটিজম কোনো রোগ নয়, বরং মস্তিষ্কের বিকাশজনিত একটি ভিন্নতা—এই সত্যটি তুলে ধরে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা ও সামাজিক সহমর্মিতা পেলে অটিজম আক্রান্ত শিশুরাও যে সমাজের মূলধারায় অবদান রাখতে পারে, আজকের দিনটি সেই বার্তারই প্রতিধ্বনি।
পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু আরোয়া। তার দুচোখে অপার বিস্ময়। হাতে ধরা রঙ-তুলি দিয়ে সাদা কাগজে কী আঁকছে, হয়তো সে নিজেও পুরোপুরি জানে না। তবে তার মা পরম মমতায় মেয়ের হাতটি ধরে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা ফুটিয়ে তুলছেন। আরোয়ার মতো এমন অসংখ্য শিশু আজ মেতে উঠেছিল রঙের উৎসবে। কেউ আঁকছিল সাজানো কোনো ঘরবাড়ি, কেউবা প্রকৃতির দৃশ্য। শিশুদের এই সৃজনশীলতার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের বাবা-মায়েরা।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত অভিভাবকরা জানান, সাধারণ শিশুদের তুলনায় অটিজম আক্রান্ত শিশুদের বড় করে তোলা চ্যালেঞ্জিং বা কঠিন হলেও এটি মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। একটু বাড়তি ধৈর্য, ভালোবাসা আর সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে এই শিশুরা নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, অটিজম হলো স্নায়বিক বিকাশের একটি বিশেষ অবস্থা (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার বলা হয়)। এটি নিরাময়যোগ্য কোনো অসুখ নয়, বরং জীবনযাপনের একটি বিশেষ ধরন। তারা জোর দিয়ে বলেন, সময়মতো শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় থেরাপি বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই শিশুদের আচার-আচরণ ও অভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। শোভাযাত্রা শেষে চিকিৎসকরা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে শিশুদের জন্য একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, যেখানে শিশুরা তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে ছবি আঁকে।
উল্লেখ্য, অটিজমে আক্রান্ত শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনমান উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২ এপ্রিলকে 'বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী নীল বাতি জ্বালিয়ে এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সেমিনার, র্যালি (শোভাযাত্রা) এবং নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অটিজম বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
অটিজম আক্রান্ত শিশুদের কেবল সহানুভূতির দৃষ্টিতে না দেখে তাদের সক্ষমতাকে শ্রদ্ধা জানানো জরুরি। আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনো এই শিশুদের নিয়ে নানা ভুল ধারণা ও কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অটিজম কোনো অভিশাপ নয়। প্রতিটি শিশুরই রয়েছে আপন আলোয় উজ্জ্বল হওয়ার অধিকার। পরিবার ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি আমরা তাদের জন্য একটি সংবেদনশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি, তবেই অটিজম সচেতনতা দিবসের সার্থকতা নিহিত হবে।