ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান নিয়ে এবার সুর নরম করতে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী না করে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার বিষয়টিকে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী তেহরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আপাতত সেখান থেকে পিছু হটতে রাজি ওয়াশিংটন।
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মোড় ঘুড়িয়ে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, তিনি এখন সামরিক অভিযান গুটিয়ে আনতেই বেশি আগ্রহী। এমনকি পারস্য উপসাগরের প্রধান বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী যদি ইরানের অবরোধে থাকে, তবুও তিনি এই যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি চান।
এর আগে কয়েক দিন ধরে ট্রাম্পের ভাষা ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তিনি হুমকি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি স্বেচ্ছায় হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয়, তবে দেশটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধূলিসাৎ করে দেওয়া হবে। কিন্তু আকস্মিকভাবেই তার এই অবস্থান পরিবর্তন সহযোগীদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আপাতত পিছু হটার অর্থ হলো ওই অঞ্চলে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হওয়া। তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনা হলো, এখন যুদ্ধ শেষ করে ভবিষ্যতে কোনো এক সময় আরও বড় ও জটিল অভিযানের মাধ্যমে এই জলপথ পুনরায় উদ্ধার করা।
মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে নতুন করে করা হিসাব-নিকাশই ট্রাম্পকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে। ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা প্রাথমিকভাবে ভেবেছিলেন চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে অভিযান সফলভাবে শেষ করা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধ ইতোমধ্যে পঞ্চম সপ্তাহে গড়িয়েছে। জোর করে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে গেলে যুদ্ধ নির্ধারিত সময়সীমা ছাড়িয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত হতে পারে। ওয়াশিংটন এই মুহূর্তে কোনো দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য এখন ইরানের নৌবাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে যতটা সম্ভব অকেজো ও দুর্বল করে দেওয়া। সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসানো এবং কূটনৈতিকভাবে জলপথ উন্মুক্ত করার জন্য চাপ সৃষ্টি করাই হবে পরবর্তী ধাপ। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবরোধ বেশি কার্যকর হতে পারে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য পথ সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এখন তার মিত্র দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে চাইছে। যদি সরাসরি মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর (উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ) সাহায্য চাওয়া হবে। হরমুজ প্রণালী ফের খোলার জন্য ওয়াশিংটন তার বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোকে সামনে রেখে একটি সম্মিলিত আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির প্রস্তাব দিতে পারে।
ট্রাম্পের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বিশ্ব তেলের বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার খবর সাময়িকভাবে স্বস্তি দিলেও, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের আধিপত্য বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এই পিছু হটা কি সত্যিই শান্তির পথে যাত্রা, নাকি আরও বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস—তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর এমন কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখনই সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।