মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ধমনী হিসেবে পরিচিত 'হরমুজ প্রণালি' দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ওমান ও ইরান। যুদ্ধের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়া এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে নিরাপদ করার উপায় খুঁজতে দুই প্রতিবেশী দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা রোববার (৫ এপ্রিল) জরুরি বৈঠকে মিলিত হন।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতা নিরসনে ওমানের রাজধানী মাস্কাটে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ওমানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার বরাতে জানা গেছে, দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠকে বিশেষজ্ঞ দল উপস্থিত ছিলেন। মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কীভাবে সামরিক উত্তজনা এড়িয়ে এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা যায়।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের জেরে এই পথে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নানামুখী তৎপরতার জবাবে ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে, যার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু নতুন পরিকল্পনা ও বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। ওমান ও ইরান উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যই নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্যের স্বার্থেও অপরিহার্য। আলোচনার একটি প্রধান অংশ জুড়ে ছিল 'শান্তিকালীন নিয়মনীতি' (পিসটাইম প্রটোকল) প্রণয়ন। ইরান জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটলে ওমানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই জলপথের জন্য স্থায়ী একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো সংকট মোকাবিলায় পথ দেখাবে।
তবে এই আলোচনার সমান্তরালে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ইরানের সংসদীয় একটি কমিটি প্রস্তাব করেছে যে, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর বিশেষ শুল্ক (টোল) আরোপ করা হতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার একটি প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে। এই কঠোর অবস্থান আলোচনার টেবিলে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
উল্লেখ্য, ওমান দীর্ঘকাল ধরেই ইরান এবং পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন বা মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে কাজ করে আসছে। এবারের বৈঠকটিকেও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখনো যুদ্ধের মেঘে ঢাকা, তবুও এই আলোচনার মাধ্যমে অন্তত একটি পথ খোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ওমানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে এবং নৌপথকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করছে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে অনেক বড় বড় জাহাজ কোম্পানি তাদের পথ পরিবর্তন করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবহন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে পণ্যের দামও আকাশচুম্বী হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ওমান ও ইরানের মধ্যেকার এই বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠকটি আন্তর্জাতিক জাহাজ মালিকদের মনে কিছুটা আশার আলো জাগিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বা জীবনরেখা। এই পথটি সামান্য সময়ের জন্য বন্ধ থাকলেও তার প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারেও অনুভূত হয়। ওমান ও ইরানের এই বৈঠক প্রমাণ করে যে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনা দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যতক্ষণ না মধ্যপ্রাচ্যের মূল রাজনৈতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধের অবসান ঘটছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখেই থাকবে। বিশ্বনেতাদের উচিত এই অঞ্চলের উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা রাখা, যাতে সাধারণ মানুষ ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় কোনো বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে।