ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিজের দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও জনশক্তির এক অভাবনীয় চিত্র তুলে ধরেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি জানিয়েছেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ লাখ ইরানি নাগরিক সামরিক বাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের এই ঘোষণা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেন, ইরান আগ বাড়িয়ে কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ চায় না। তবে দেশটির পবিত্র ভূমি যদি কোনোভাবে আক্রান্ত হয়, তবে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সশস্ত্র বাহিনী—সবাই মিলে তার দাঁতভাঙা জবাব দেবে। তিনি উল্লেখ করেন, যখনই দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, তখন প্রতিটি নাগরিক একজন অকুতোভয় সৈনিকের পরিচয় ধারণ করেন।
স্পিকারের দেওয়া তথ্যমতে, মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে শুরু হওয়া একটি জাতীয় প্রচারণায় অভূতপূর্ব সাড়া মিলেছে। লাখ লাখ ইরানি নাগরিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশ রক্ষায় অস্ত্র তুলে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এই বিশাল জনশক্তি যেকোনো আধুনিক সমরাস্ত্রের চেয়েও বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। গালিবাফ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "আমাদের সীমান্তে আঘাত হানলে পুরো জাতির মুখোমুখি হতে হবে। সাহস থাকলে এসে দেখো।" তার এই চ্যালেঞ্জ সরাসরি পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্দেশ্যেই ছোঁড়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এদিকে, সম্ভাব্য বিদেশি স্থল অভিযান মোকাবিলায় ইরানের সামরিক বাহিনীকেও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। দেশটির সেনাপ্রধান আমির হাতিমি এক ভিডিও বার্তায় অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা জারি করেছেন। সরকারি গণমাধ্যমে প্রচারিত সেই বার্তায় তাকে সেনাসদস্যদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায় যে, শত্রুপক্ষ যদি স্থলপথে ইরানে প্রবেশের বিন্দুমাত্র দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের একজন সেনাকেও যেন জীবিত ফেরত যেতে দেওয়া না হয়। তিনি প্রতিটি পদক্ষেপে শত্রুর গতিবিধি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক সময়ে বিধ্বংসী পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরানের এই অনড় অবস্থান এবং বিশাল জনশক্তির যুদ্ধের প্রস্তুতি মূলত ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে (পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী সমুদ্রপথ) উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই ৭০ লাখ মানুষের এই প্রস্তুতির খবর নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগে জনশক্তি কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু যখন একটি দেশের বিশাল জনসংখ্যা আদর্শিক কারণে আত্মত্যাগের সংকল্প করে, তখন সেটি যেকোনো আক্রমণকারীর জন্য বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের এই বিপুল স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এটি স্পষ্ট যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের এই বহিঃপ্রকাশ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। শক্তির লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কূটনীতি নাকি যুদ্ধ জয়ী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।