বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ এক নতুন মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক ভাষণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যকে একপ্রকার উপহাসের স্বরে কড়া বার্তা দিয়েছে রাশিয়া। মস্কো সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত জ্বালানি পেতে হলে পশ্চিমা দেশগুলোকে নিজেদের ‘ভুল’ স্বীকার করে রাশিয়ার দুয়ারে লাইনে দাঁড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির মঞ্চে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বরাবরই রাশিয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি (পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ) নিয়ে ওয়াশিংটনের অনাগ্রহের কথা জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পাহারায় থাকতে চায় না।
যারা এই পথ ব্যবহার করে তেল আমদানি করে, তারা যেন নিজ দায়িত্বেই তাদের জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের মূল সুর ছিল—আমেরিকা এখন নিজেই জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিশ্ব চাইলে আমেরিকার কাছ থেকে তেল কিনতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই রণকৌশলগত বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাশিয়ার পক্ষ থেকে একটি তীক্ষ্ণ ও শ্লেষাত্মক প্রতিক্রিয়া আসে। রাশিয়ার বিশেষ প্রেসিডেন্সিয়াল দূত এবং ‘রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ বা রাশিয়ার সরাসরি বিনিয়োগ তহবিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিরিল দিমিত্রিয়েভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যকে তাদের অতীতের সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা করার পরামর্শ দেন।
দিমিত্রিয়েভ তাঁর বার্তায় বলেন, ইউরোপের দেশগুলোকে এখন তাদের ভুল বুঝতে হবে। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে উদ্দেশ করে বলেন, “প্রায়শ্চিত্ত করুন, উত্তেজনা কমান এবং নিজেদের অর্থ খরচ করে ‘নর্ড স্ট্রিম-২’ (রাশিয়া থেকে ইউরোপে সরাসরি গ্যাস পাঠানোর জন্য সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে তৈরি করা পাইপলাইন) পুনর্নির্মাণ করুন।” তিনি আরও যোগ করেন যে, যদি ইউরোপ সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার এবং হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ফেরত পেতে চায়, তবে তাদের রাশিয়ার কাছে ধরণা দিতে হবে এবং লাইনে দাঁড়াতে হবে।
রাশিয়ার এই দূতের মন্তব্য কেবল একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি ইউরোপের বর্তমান ভঙ্গুর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর একটি বড় আঘাত। ইউক্রেন সংকটের পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং রুশ জ্বালানির বিকল্প খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। দিমিত্রিয়েভ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রাশিয়ার জ্বালানি ছাড়া ইউরোপের শিল্প ও অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কঠিন। বিশেষ করে ট্রাম্প যখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের নিরাপত্তা থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তখন রাশিয়ার এই প্রস্তাব ইউরোপকে এক কঠিন সমীকরণের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।
রাশিয়ান এই কর্মকর্তা আরও মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল নিজেদের স্বার্থ দেখছে। ট্রাম্পের ভাষণে মার্কিন তেল বিক্রির যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা ইউরোপের জন্য সাশ্রয়ী হবে না বলেই মস্কোর বিশ্বাস। অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আসা গ্যাস ও তেল ইউরোপের জন্য ঐতিহাসিকভাবেই সবচেয়ে লাভজনক ছিল। মস্কো এখন সেই পুরোনো নির্ভরতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে ইউরোপকে তাদের হারানো পথে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছে, তবে তার আগে শর্ত জুড়ে দিয়েছে—নিজেদের ‘ভুল’ স্বীকার করা এবং যুদ্ধের উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় আসা।
বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, তাতে জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম একটি বড় কারণ। রাশিয়ার দাবি, তারা কেবল তেল বা গ্যাস নয়, বরং কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য সার এবং উন্নত প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হিলিয়ামও সরবরাহ করতে সক্ষম, যা বর্তমানে বিশ্ববাজারে সংকটে রয়েছে। রাশিয়ার এই বার্তা মূলত ইউরোপের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার একটি কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ইউরোপ এখন এক মহাসংকটের মুখে। একদিকে মিত্র রাষ্ট্র আমেরিকার নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা, অন্যদিকে রাশিয়ার সরাসরি চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে ইউরোপ কার ওপর ভরসা করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। রাশিয়ার ‘লাইনে দাঁড়ানোর’ এই আহ্বান কেবল উপহাস নয়, বরং এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা যা ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের পুনরায় ভাবতে বাধ্য করবে। জাতীয় স্বার্থ এবং নাগরিক সুবিধা রক্ষায় ইউরোপ কি তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসবে, নাকি আরও বড় কোনো সংকটের দিকে এগিয়ে যাবে? বিশ্ব রাজনীতির এই দাবার চালে সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কী আছে, তা সময়ই বলে দেবে।