বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে ঘনীভূত হওয়া উত্তেজনা নিরসনে বড় এক ধাক্কা লেগেছে। সাময়িক যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে এই কৌশলগত জলপথটি খুলে দেওয়ার যে প্রস্তাব পাকিস্তান দিয়েছিল, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের সাফ কথা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে কেবল সাময়িক স্থিতিশীলতায় আগ্রহী, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো কার্যকর সমাধান বয়ে আনবে না।
বিশ্ব রাজনীতির উত্তপ্ত মঞ্চে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান এই ধমনিটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে যখন উদ্বেগের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক তখনই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এগিয়ে আসে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ থেকে দুই ধাপের একটি বিস্তৃত শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত শত্রুতা বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু ইরানের অনড় অবস্থানের কারণে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আপাতত আলোর মুখ দেখছে না।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দেওয়া এই শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ছিল উভয় পক্ষের মধ্যে অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। দ্বিতীয় ধাপে ছিল দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো। পাকিস্তান এই প্রস্তাবটি ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের উচ্চপর্যায়েই পৌঁছে দিয়েছিল। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছিল, সোমবারই এই চুক্তির প্রাথমিক বিষয়গুলো চূড়ান্ত করে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ইরানের অস্বীকৃতিতে পুরো প্রক্রিয়াটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ইরানের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা পাকিস্তানের প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করেছেন। তবে তেহরান কোনো ধরনের সময়সীমা বা বাইরের চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। তাদের প্রধান অভিযোগ ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে। ইরানের দাবি, হোয়াইট হাউস বা মার্কিন প্রশাসন একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়। ইরান মনে করে, সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিলে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত সুবিধাগুলো গুছিয়ে নেবে, কিন্তু ইরানের ওপর আরোপিত দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক আচরণ বা নিষেধাজ্ঞাগুলো থেকে যাবে অপরিবর্তিত।
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা স্মারকের মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল একটি বড় ধরনের লেনদেন। শর্ত অনুযায়ী, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি (পরমাণু শক্তিকে অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার না করা) থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার নিশ্চয়তা দেবে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সব অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। একই সাথে বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে জব্দ বা আটকে রাখা ইরানের বিশাল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ অবমুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু ইরানের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছার অভাবেই এই ধরনের একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক চুক্তি সম্ভব হচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির জীবনীশক্তি। বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি তেল এই পথ দিয়ে যায়, তার সামান্যতম বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে এই পথে চলাচলে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে উন্নত থেকে উন্নয়নশীল—সব দেশের অর্থনীতিতেই মুদ্রাস্ফীতির (দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া) চাপ সৃষ্টি হবে।
ইরানের কঠোর অবস্থান এবং ওয়াশিংটনের রহস্যময় নীরবতা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল করে তুলছে। ইসলামাবাদ যদিও এখনও হাল ছাড়েনি এবং উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে, তবে তেহরানের বর্তমান মনোভাব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, স্থায়ী কোনো নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি ছাড়া তারা হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে অবরোধ সরাবে না।
হরমুজ প্রণালির এই সংকট কেবল দুটি দেশের দ্বৈরথ নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট, তা নিরসনে পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতা প্রশংসনীয় হলেও তা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করছে বিবদমান পক্ষগুলোর সদিচ্ছার ওপর। শক্তি প্রদর্শন করে নয়, বরং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান হওয়া জরুরি। অন্যথায়, এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তার খেসারত দিতে হবে গোটা বিশ্বের সাধারণ মানুষকে। বিশ্বনেতারা কি পারবেন একটি স্থায়ী শান্তিতে পৌঁছাতে, নাকি সংকটের এই চোরাবালিতেই ডুববে বৈশ্বিক অর্থনীতি—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে