ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে আবারও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। ইস্তানবুলের ঐতিহাসিক প্রাসাদে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বিশ্বরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে শনিবার (৪ এপ্রিল) তুরস্কের ইস্তানবুলে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এর মাত্র একদিন আগে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপ করেন এরদোয়ান। পুতিনের সঙ্গে আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই জেলেনস্কির সঙ্গে এই সরাসরি সাক্ষাৎ ইউক্রেন সংকট সমাধানে তুরস্কের সক্রিয় কূটনীতিরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ অধিদপ্তর (কমিউনিকেশন ডাইরেক্টরেট) জানিয়েছে, বৈঠকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষার উপায় নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠক চলাকালীন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান স্পষ্ট করে বলেন যে, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার লক্ষে তুরস্ক তার সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে হলে সব পক্ষকে নিয়ে একটি সমন্বিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো এখন সময়ের দাবি।
আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল কৃষ্ণ সাগরের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা রক্ষা করা। যুদ্ধের ফলে কৃষ্ণ সাগরের বুক চিরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল প্রায়ই ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি করছে। এরদোয়ান এই জলপথে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জেলেনস্কির সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়েও দুই নেতা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। বিশেষ করে তুরস্ক ও ইউক্রেনের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয় এবং আঙ্কারা (তুরস্কের রাজধানী) এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে জানানো হয়। ইউক্রেন তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যে চেষ্টা চালাচ্ছে, এরদোয়ান তার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং একে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।
উল্লেখ্য যে, ইউক্রেন ও রাশিয়ার এই সামরিক সংঘাত কেবল দুই দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বে। গত কয়েক বছরে উভয় পক্ষ থেকে দফায় দফায় বিমান হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। রণক্ষেত্রে হাজার হাজার সৈন্যের পাশাপাশি অগণিত সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। বিশেষ করে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হাসপাতাল ও আবাসিক ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই মানবিক বিপর্যয় রোধ করতেই এরদোয়ান বিশ্বনেতাদের এক হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান মনে করেন, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং টেবিলের আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তুরস্ক শুরু থেকেই যুদ্ধের বিপক্ষে এবং সংলাপের পক্ষে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় রেখেছে। জেলেনস্কির সঙ্গে এই বৈঠক সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই একটি ধারাবাহিকতা।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে তুরস্কের অবস্থান সবসময়ই অত্যন্ত কৌশলী ও ভারসাম্যপূর্ণ। ন্যাটোর (উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট) সদস্য হয়েও রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ইউক্রেনকে সহায়তা করা—এরদোয়ানের এই দ্বিমুখী কূটনীতি তাকে একজন শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ হবে কি না, তা কেবল এরদোয়ানের চেষ্টার ওপর নয়, বরং বিবদমান দুই দেশের অনমনীয় মনোভাব পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। ইউক্রেন যেখানে তার হারানো ভূখণ্ড ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, সেখানে রাশিয়া তার লক্ষ্য অর্জনে অটল। এই দুই বিপরীতধর্মী অবস্থানের মধ্যে তুরস্ক কীভাবে একটি সাধারণ ক্ষেত্র তৈরি করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যুদ্ধের দামামা থামিয়ে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে তুরস্কের এই উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।