পুরোনো বছরের সমস্ত জীর্ণতা, বিষাদ আর গ্লানিকে পেছনে ফেলে নতুন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হলো ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর বাঙালির নিজস্ব জাতিসত্তার চিরন্তন আহ্বানে আজ মঙ্গলবার দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ— বাঙালির প্রাণের উৎসব।
ঋতুচক্রের অমোঘ নিয়মে বৈশাখ আসে নতুনের বার্তা নিয়ে। হাজার বছরের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এই মহামিলনমেলা আজ কেবল একটি পঞ্জিকা পরিবর্তনের দিন নয়, বরং এটি বাঙালির পুনর্জাগরণ ও ঐক্যের এক অবিচ্ছেদ্য স্মারক। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে টেকনাফ-তেঁতুলিয়ার প্রতিটি জনপদে আজ উৎসবের আমেজ। ধর্ম, বর্ণ আর জাতপাত ভুলে কোটি কোটি বাঙালি মেতে উঠেছে আনন্দ-উৎসবে।
ভোরের প্রথম আলো ফুটে ওঠার পরপরই রাজধানীর রমনার বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। এবারের আয়োজনের মূল ভাবনা ছিল ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। এই বাণীর মধ্য দিয়েই উচ্চারিত হয়েছে বাঙালির নির্ভীক পথচলা আর সত্য ও সুন্দরের জয়গান।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে পহেলা বৈশাখকে বাঙালির জাতীয় ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, অতীতের সব ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নব উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায় এই বৈশাখ। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পহেলা বৈশাখকে বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনন্য প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, কৃষিনির্ভর এই ভূখণ্ডে আমাদের অর্থনীতি ও প্রকৃতির সাথে বৈশাখের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। প্রযুক্তির এই যুগেও লোকজ ঐতিহ্য আর মূল্যবোধকে ধারণ করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।\
রাজধানীর রাজপথ আজ বর্ণিল সাজে সজ্জিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের শোভাযাত্রায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পাঁচটি লোকজ প্রতীক— মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। এই প্রতীকগুলো যথাক্রমে শক্তি, সৃজনশীলতা, শান্তি, গৌরব ও গতির বারতা বহন করছে। বাঁশ, কাঠ ও রঙিন কাগজে তৈরি বাঘ ও বিড়ালের বিশাল সব মুখাবয়ব শোভাযাত্রাকে দিয়েছে অনন্য এক রূপ। ৩৫ জন যন্ত্রী এবং ২০০ জন শিক্ষার্থীর জাতীয় পতাকা হাতে অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে করেছে আরও প্রাণবন্ত।
শহরের পাশাপাশি গ্রামবাংলাও মেতেছে বৈশাখী উচ্ছ্বাসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসেছে লোকজ মেলা। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলিখেলা (কুস্তি প্রতিযোগিতা) দেখার জন্য সমবেত হয়েছে হাজারো মানুষ। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে লাঠিখেলা ও হা-ডু-ডু’র মতো গ্রাম্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
সংস্কৃতিকেন্দ্রিক অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ‘সামাজিক ফ্যাসিবাদ ধ্বংসের’ প্রত্যয় নিয়ে তোপখানা রোডে দিনব্যাপী আড্ডা, গান ও কবিতার আয়োজন করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও শিল্পকলা একাডেমি দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করছে। উৎসবের নিরাপত্তায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও র্যাব বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
পহেলা বৈশাখ কেবল পান্তা-ইলিশের কোনো অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের লড়াই আর টিকে থাকার সংস্কৃতির অংশ। আজকের এই দিনে আমাদের শপথ হোক— সব ধরনের অন্ধত্ব আর সংকীর্ণতা দূর করে একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলা। যখন সমাজ ও সংস্কৃতিতে বিভাজনের রেখা স্পষ্ট হতে চায়, তখন বৈশাখী মেলা আর মঙ্গল শোভাযাত্রার এই মিলনমেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা পরিচয় নির্বিশেষে কেবলই বাঙালি। এই সম্প্রীতির সুর কি আমরা বছরের বাকি দিনগুলোতেও ধরে রাখতে পারি না?