দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অপচয় রোধে এক যুগান্তকারী সমাধান নিয়ে এসেছেন তরুণ উদ্যোক্তা ও গবেষক প্রকৌশলী জাকারিয়া মালিক। তার উদ্ভাবিত 'সেন্ট্রাল ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম' ব্যবহারের মাধ্যমে এখন এক ক্লিকেই জানা যাবে জ্বালানি তেলের গতিবিধি, যা নিশ্চিত করবে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা।
বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের শিল্প-কারখানাগুলো তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বিশেষ করে মার্চের শুরু থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও তেলের দেখা মিলছে না—এমন পরিস্থিতিতে অব্যবস্থাপনার চিত্রটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। চালকদের মতে, বর্তমান সেকেলে ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই ভোগান্তি দূর করা অসম্ভব।
এই সংকটময় মুহূর্তে প্রকৌশলী জাকারিয়া মালিকের উদ্ভাবিত সিস্টেমটি আশার আলো দেখাচ্ছে। এই পদ্ধতিতে জ্বালানি আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খোলা থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ফোঁটা ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের হিসাব রাখা সম্ভব হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং পোর্টালের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সহজ ও ব্যবহারকারী বান্ধব। প্রতিটি যানবাহনকে তাদের লাইসেন্স নম্বর দিয়ে একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করতে হবে। ফিলিং স্টেশনে পৌঁছে চালক তার স্মার্টফোন বা পাম্পের কিউআর কোড স্ক্যান করলেই গাড়িটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত হয়ে যাবে। কত লিটার তেল নেওয়া হলো, তা তাৎক্ষণিকভাবে পাম্পের হিসাবের পাশাপাশি জাতীয় রিজার্ভের তথ্যেও হালনাগাদ হবে। এতে করে একই গাড়ি বারবার বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল নিয়ে মজুত বা পাচার করছে কি না, তা সহজেই ধরা পড়বে।
জাকারিয়া মালিকের মতে, এই ব্যবস্থার ফলে শুধু নিবন্ধিত যানবাহনই তেল পাবে, যা প্রকারান্তরে সড়ক থেকে অবৈধ যানবাহন দূর করতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক খাতে জ্বালানির ব্যবহারও এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তথ্যের অভাবেই মূলত দুর্নীতি বাসা বাঁধে। এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে ডিপো থেকে তেল বের হওয়া থেকে শুরু করে গন্তব্য পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবিরও একমত পোষণ করে জানান যে, বর্তমান প্রযুক্তিতে অত্যন্ত কম খরচে এই মনিটরিং ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সম্ভব। এটি চালু হলে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে সরকার।
বর্তমানে সরকার ও পাম্প মালিকরা দেশে পর্যাপ্ত তেল মজুত থাকার দাবি করলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না। জনসাধারণের মনে প্রশ্ন—যদি মজুত ঠিক থাকে, তবে তেল যাচ্ছে কোথায়? বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, বিপণন কাঠামোতে এই ডিজিটাল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল সাধারণ মানুষের এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব এবং নিশ্চিত হবে দেশের জ্বালানি সুরক্ষা।
প্রযুক্তি যখন বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসছে, তখন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় এনালগ পদ্ধতি বা সনাতন হিসাবরক্ষণ দুর্নীতির পথকে প্রশস্ত করে। জাকারিয়া মালিকের এই উদ্ভাবন কেবল একটি সিস্টেম নয়, এটি একটি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিফলন। যদি সরকার দ্রুত এই ধরনের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে, তবে একদিকে যেমন তেলের চুরি ও অপচয় কমবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হোক জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান।