উৎসবের আনন্দে সম্প্রচারিত নাটকগুলোর মধ্যে দর্শকের মনোযোগের কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে ‘মায়া পাখি’। একদিকে যেমন কোটি দর্শক নাটকটি দেখে প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে কর্মজীবী নারীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ তুলে অনেকেই এর কড়া সমালোচনা করছেন। এই তুমুল বিতর্কের মাঝেই এবার মুখ খুললেন নাটকের মূল অভিনয়শিল্পী নাজনীন নিহা, দিলেন সমালোচকদের কড়া জবাব।
উৎসবের ছুটিতে সাধারণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম বড় মাধ্যম হলো ছোট পর্দার নাটক। প্রতিবারের মতো এবারও উৎসবকে কেন্দ্র করে অসংখ্য নাটক সম্প্রচারিত হয়েছে। তবে গল্প এবং নির্মাণের চমৎকার মুন্সিয়ানায় আলাদাভাবে দর্শকদের নজর কেড়েছে নির্মাতা জাকারিয়া সৌখিনের ‘মায়া পাখি’। মুক্তির পরপরই এটি বিনোদনপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। অন্তর্জাল মাধ্যমে (যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের বৈদ্যুতিক মাধ্যম) এরই মধ্যে নাটকটির দর্শনসংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে। দর্শকদের একটি বড় অংশ গল্পের আবেগে ভাসার পাশাপাশি চরিত্রগুলোর বাস্তবমুখী অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
তবে আকাশছোঁয়া এই সাফল্যের সমান্তরালে তৈরি হয়েছে তীব্র সমালোচনাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একদল দর্শক অভিযোগ তুলেছেন যে, এই নাটকে কর্মজীবী নারীদের অত্যন্ত নেতিবাচক ও খাটো করে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের মতে, সমাজের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকা যে নারীরা নিজেদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এবং সংসারের হাল ধরছেন, এই নাটকের কিছু দৃশ্য তাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত করেছে। বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো তর্ক-বিতর্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে চারদিকে।
বর্তমান সমাজে নারীরা যখন শত বাধা পেরিয়ে নিজেদের কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন তাদের নিয়ে নির্মিত যেকোনো আধেয় (কনটেন্ট) বা গল্প অত্যন্ত সংবেদনশীলতার দাবি রাখে। ক্ষুব্ধ দর্শকরা মনে করেন, কর্মজীবী নারীদের জীবনের সংগ্রাম ও ত্যাগের দিকগুলো এড়িয়ে গিয়ে শুধুমাত্র নেতিবাচক দিকগুলো বড় করে দেখালে সমাজে তাদের সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
সমালোচনার এই তুমুল ঝড়ের মধ্যে এবার বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘মায়া’-তে অভিনয় করা তরুণ অভিনেত্রী নাজনীন নিহা। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, নাটকে কোনো বিশেষ শ্রেণি বা পেশার মানুষকে ছোট করার কোনো উদ্দেশ্য তাদের ছিল না। নিহার মতে, আমাদের চারপাশের বাস্তব সমাজেই এমন অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে, যা কেবল গল্পের প্রয়োজনে পর্দায় তুলে ধরা হয়েছে। এখানে অবাস্তব বা কাল্পনিক কিছু দেখানো হয়নি।
এই অভিনেত্রী আরও বলেন, "খারাপ কোনো কাজকে এই নাটকে মহিমান্বিত বা গৌরবান্বিত করা হয়নি। বরং পুরো গল্পজুড়ে দর্শকদের জন্য একটি স্পষ্ট ও শিক্ষণীয় বার্তা লুকিয়ে রয়েছে। খারাপ কাজের পরিণতি যে কখনো ভালো হয় না, নাটকটির শেষ অংশটুকু মনোযোগ দিয়ে দেখলে যে কেউই তা সহজেই বুঝতে পারবেন।" মূলত বাস্তবতার আয়নায় সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশের চিত্র তুলে ধরাই ছিল নির্মাতার মূল লক্ষ্য, এমনটাই মনে করেন এই অভিনয়শিল্পী।
বিতর্কের বাইরে গিয়ে নাটকটিতে নাজনীন নিহার সাবলীল ও প্রাণবন্ত অভিনয় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। তবে নিজের এই সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব তিনি দিতে চান সহশিল্পী জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব এবং নির্মাতা জাকারিয়া সৌখিনকে। পর্দার পেছনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নিহা বলেন, "অপূর্ব ভাই এবং সৌখিন ভাই প্রতিটি দৃশ্যের বিষয়ে আমাকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন। কোন দৃশ্যে ঠিক কতটা আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশ করতে হবে, ক্যামেরার সামনে কীভাবে দাঁড়াতে হবে—তা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তারা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমি নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।"
নিজেকে এখনো অভিনয়ের বিশাল জগতে একজন শিক্ষানবিশ (যিনি নতুন কাজ শিখছেন বা শিখতে আগ্রহী) মনে করেন নিহা। দর্শকদের বিপুল ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি আগামীতে আরও পরিণত ও মানসম্মত কাজ উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ‘মায়া পাখি’ নাটকের গল্পটি ভেবেছেন অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব নিজেই, যা পর্দায় নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নির্মাতা সৌখিন।
শিল্প ও সাহিত্য সবসময়ই সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করে। ‘মায়া পাখি’ নাটকের গল্প নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আসলে শিল্পের স্বাধীনতা এবং দর্শকদের দৃষ্টিকোণের একটি চিরায়ত দ্বন্দ্ব। সমাজের কোনো রুঢ় সত্য পর্দায় তুলে ধরলেই তা কোনো বিশেষ শ্রেণিকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, এমনটা ভেবে নেওয়া হয়তো সব সময় সঠিক নয়। কারণ সমাজে যেমন আলোকিত মানুষ আছেন, তেমনি অন্ধকার পথের মানুষও রয়েছেন। তবে নির্মাতাদেরও খেয়াল রাখা উচিত, তাদের উপস্থাপিত কোনো দৃশ্য যেন সমাজে নারী বা অন্য কোনো সংবেদনশীল গোষ্ঠীর প্রতি ভুল বার্তা না দেয়। শেষ পর্যন্ত দর্শকদের এই ধরনের গঠনমূলক সমালোচনাই পারে আমাদের বিনোদন জগৎকে আরও পরিণত, যৌক্তিক ও দায়িত্বশীল করে তুলতে।