ভোরের স্নিগ্ধ আলো যখন পুব আকাশে উঁকি দিচ্ছিল, তখনই সুরের মূর্চ্ছনায় জেগে ওঠে রমনার অশ্বত্থমূল। পুরনো বছরের জীর্ণতা মুছে ফেলে নতুন উদ্দীপনায় আজ মঙ্গলবার ভোরে বাঙালির প্রাণের প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের আয়োজনে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ উৎসব।
পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির আপন সত্তার জাগরণ। সূর্যোদয়ের পর মুহূর্তেই রাজধানীর রমনা উদ্যানের বটমূলে শুরু হয়েছে ছায়ানটের বিশেষ প্রভাতী আয়োজন। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের সুরে শুরু হয় নতুন বছর ১৪৩৩-কে বরণ করে নেওয়ার মহোৎসব। এবারের অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য বা ভাবনা নির্ধারণ করা হয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর উক্তি— ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’।
পুরো অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছে বাংলা সাহিত্যের পঞ্চকবির গান ও লোকজ সুরের আবেশে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ ও জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কালজয়ী সব গান নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের ডালি। ছায়ানট সূত্রে জানা গেছে, আজকের এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে মোট ২২টি সংগীত পরিবেশিত হচ্ছে। এর মধ্যে ৮টি সম্মিলিত গান এবং ১৪টি একক কণ্ঠের গান রয়েছে। গানের মাঝে মাঝে প্রাসঙ্গিক কবিতা ও পাঠ অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ছায়ানটের এই সুবিশাল আয়োজনে প্রতিষ্ঠানটির শিশু বিভাগ থেকে শুরু করে সকল স্তরের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং দেশের বরেণ্য সংগীতশিল্পীরা অংশ নিয়েছেন। প্রায় ২০০ শিল্পীর সম্মিলিত কণ্ঠে যখন সুর ঝঙ্কৃত হয়, তখন রমনার আকাশ-বাতাস এক অনন্য উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। মাঠজুড়ে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও সুরের নিবিড়তায় সবাই যেন এক সুতোয় গাঁথা।
প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের কল্যাণে এই উৎসব এখন কেবল রমনায় সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং দীপ্ত টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করছে। পাশাপাশি ছায়ানটের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইউটিউব চ্যানেল এবং বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে অনুষ্ঠানটি সরাসরি উপভোগ করছেন দেশ-বিদেশের লাখো বাঙালি।
রমনার পাশাপাশি রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও শুরু হয়েছে বর্ণিল আয়োজন। সেখানে চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’। ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ঋষিজ শিল্পগোষ্ঠীও পৃথকভাবে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সাল থেকে বাঙালি সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখতে ছায়ানট এই বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজন করে আসছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের আগের সেই উত্তাল দিনগুলোতেও এই বটমূল ছিল বাঙালির প্রতিবাদের ভাষা। কালক্রমে এটি কেবল একটি সংগীতানুষ্ঠান নয়, বরং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির এক অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয়। ছায়ানটের এই আয়োজন কেবল বিনোদন নয়, বরং সংকীর্ণতা আর ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত চিন্তার এক বিশাল আহ্বান। যখন আমাদের সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’—এই বাণী আমাদের আত্মবিশ্বাস যোগায়। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আমাদের যাপিত জীবনে এই নির্ভয় ও উচ্চ শিরের মানসিকতা লালন করতে পারছি? বৈশাখের এই সুর যেন কেবল একদিনের না হয়ে সারা বছরের প্রেরণা হয়ে থাকে।