বাঙালির চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের আবাহনে চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য আয়োজন রাজধানীসহ সংস্কৃতিমনা মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেবে।
নতুন বছরকে বরণ করে নিতে এবার শিল্পকলা একাডেমি সাজিয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা। পাঁচ দিনের কর্মসূচিতে থাকছে লাঠিখেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, জারি-সারি, পুঁথিপাঠ, যাত্রাপালা ও পুতুলনাচ। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এই আয়োজনে যোগ করবে ভিন্ন মাত্রা।
উৎসবের প্রথম দিন (১৩ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় একাডেমির উন্মুক্ত মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন। উদ্বোধনী দিনে জাতীয় চিত্রশালার ৪ নম্বর গ্যালারিতে বিশেষ ‘লোকশিল্প প্রদর্শনী’র আয়োজন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক পর্বে থাকছে ৫০ জন যন্ত্রশিল্পীর সম্মিলিত পরিবেশনা এবং একাডেমির রেপার্টরি যাত্রাদলের পরিবেশনায় জনপ্রিয় যাত্রাপালা ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’।
পহেলা বৈশাখের দিন (১৪ এপ্রিল) বিকেল ৪টায় শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে বের করা হবে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা। শতকণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে গানে স্বাগত জানানো হবে নতুন বছরকে। এদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। এছাড়া গম্ভীরা, বাউল গান এবং গাজীর গানের সুর ও মূর্ছনায় মাতবেন দর্শনার্থীরা।
তৃতীয় দিন ১৫ এপ্রিল বিকেল ৪টায় জাসাসের বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক ইথুন বাবুর নির্দেশনায় থাকবে সংগীত সন্ধ্যা এবং রাজবাড়ীর শিল্পকলা একাডেমির সদস্যদের রোমাঞ্চকর ‘অ্যাক্রোব্যাটিক’ (শারীরিক কসরত) প্রদর্শনী। পরদিন ১৬ এপ্রিল প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। এদিনের বিশেষ আকর্ষণ হলো ‘জাতি বৈচিত্র্যে বৈশাখী উৎসব’ এবং সন্ধ্যা ৭টায় পুতুলনাচ ‘বাছেরের বিয়ে’।
১৭ এপ্রিল সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। সমাপনী আয়োজনে ৫০ জন নৃত্যশিল্পীর কোরিওগ্রাফি (নাচের মুদ্রা বিন্যাস), তারকা শিল্পীদের ব্যান্ড সংগীত এবং জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ প্রদর্শনীর মাধ্যমে পর্দা নামবে এই পাঁচ দিনের মহা-উৎসবের। পুরো আয়োজনটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
বাঙালির পরিচয় ও অস্তিত্বের মূলে রয়েছে তার সংস্কৃতি। আধুনিকতার ভিড়ে আমাদের লোকজ ঐতিহ্যগুলো যখন হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন শিল্পকলা একাডেমির এই ৫ দিনব্যাপী আয়োজন শেকড়ের সন্ধানে এক বড় ভূমিকা রাখবে। গ্রামবাংলার লাঠিখেলা থেকে শুরু করে যাত্রাপালা পর্যন্ত সব উপকরণ বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা আমাদের সাংস্কৃতিক সংহতিকে আরও শক্তিশালী করবে। এই উৎসব কেবল আনন্দ নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য স্মারক।