প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন ঠাঁই খুঁজছে নগরের বস্তিতে। নদীভাঙন, লোনা জল আর ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের সামনে এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে গতকাল বুধবার ‘নগর জলবায়ু অভিযোজন: সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তি চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কারিতাস বাংলাদেশ ও সমকাল-এর যৌথ আয়োজনে এই বৈঠকে দেশের প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবাদী এবং সরকারি আমলারা এক সুরে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন। বক্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বিক্ষিপ্ত কোনো পদক্ষেপে এই মানবিক বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী এবং বাস্তবসম্মত জাতীয় কৌশল।
বৈঠকে ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত এক তিক্ত সত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ৭০০ কোটি টাকার তহবিলসহ নানা বড় বড় প্রকল্প (যেমন: ডেল্টা প্ল্যান বা বদ্বীপ পরিকল্পনা) নেওয়া হলেও সঠিক সমন্বয়ের অভাবে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে কৃষি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ মারাত্মকভাবে কমে আসবে। তাই মানুষকে কেবল শহরে আসতে বাধা দিলেই হবে না, বরং তাদের নিজ গ্রামেই বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের ২১টি জেলার মানুষ এখন নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন, সরকার যদি এসব মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ (পারিবারিক কার্ড) কর্মসূচির আওতায় বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করে, তবে তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। পাশাপাশি বস্তিবাসীসহ সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও নিরাপদ বাসস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়ার দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তায়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেন, দুর্যোগে ঘর হারানো মানুষকে কেবল একটি দালান বা ঘর তুলে দিলেই সমাধান হবে না; বরং তাদের জন্য কৃষিবীমা বা গৃহবীমা চালু করা জরুরি। অন্যদিকে নগরবিদ ইকবাল হাবিব এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রতি বছর তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষ নানা কারণে উদ্বাস্তু হয়ে নগরের বস্তিতে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হন। অথচ সরকারের কাছে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তাদের ‘অদৃশ্য’ রেখে কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে সরকার আন্তরিক। ইতোমধ্যে সমাজসেবার অর্ধশতাধিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে এবং বস্তিবাসীদের জন্য আধুনিক আবাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মূল প্রবন্ধে ড. তাসনিম সিদ্দিকী বিশ্বব্যাংকের বরাত দিয়ে জানান, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ নিজ ভূমিতেই পরবাসী বা উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে।
খুলনা থেকে আসা ভুক্তভোগী সাবিনা খাতুন নিজের জীবনের লড়াইয়ের কথা শুনিয়ে জানান, আইলা ঝড়ে সব হারিয়ে তিনি আজ নিঃস্ব। জাতীয় পরিচয়পত্র বা সরকারি সহায়তা কার্ড না থাকায় কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না তিনি। তাঁর মতো হাজারো মানুষের এই হাহাকার প্রশমনে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে হাতে হাত রেখে কাজ করার আহ্বান জানানো হয় এই বৈঠকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই লড়াইয়ে বাংলাদেশ আসলে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত। প্রকৃতি যখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রান্তিক মানুষ। শহরগুলোতে বস্তিবাসীর সংখ্যা বাড়িয়ে নগরের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে, বরং উপকূলেই যদি জলসহিষ্ণু চাষাবাদ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা যায়, তবেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন কেবল বড় বড় দালানের নয়, উন্নয়ন হতে হবে সেই শেষ মানুষটিরও যে আজ প্রকৃতির তাণ্ডবে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছে।