ভয়াবহ এক মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বরিশাল। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে এই শহরের মাটি, যার ফলে হেলে পড়ছে বহুতল ভবন এবং স্থায়ী রূপ নিচ্ছে জলাবদ্ধতা।
দক্ষিণের জনপদ বরিশাল এখন খাদের কিনারে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় পৌনে দুই মিলিমিটার করে দেবে যাচ্ছে এই শহরের মাটি। আপাতদৃষ্টিতে এই সংখ্যাটি সামান্য মনে হলেও, কোনো কোনো এলাকায় এই দেবে যাওয়ার পরিমাণ এক ইঞ্চি পর্যন্ত ঠেকেছে। বিষয়টি এখন আর কেবল তত্ত্বীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; শহরের বৌদ্ধপাড়া, বিএম কলেজ এলাকা, বটতলা ও করিম কুটিরের মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে একাধিক বহুতল ভবন হেলে পড়ার দৃশ্য এই বিপদেরই আগাম বার্তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ও জার্মানির একটি গবেষণা সংস্থা দীর্ঘ ছয় বছর ধরে যৌথ অনুসন্ধান চালিয়ে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ—অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন।
শহরজুড়ে বর্তমানে ৭৫ হাজারেরও বেশি নলকূপ রয়েছে। পানির চাহিদা মেটাতে মাটির গভীরতম স্তর থেকে অনবরত পানি তোলা হচ্ছে, যার ফলে মাটির নিচে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। আর এই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়েই উপরের মাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে বসে যাচ্ছে। পরিবেশবাদীদের মতে, একসময় বরিশাল ছিল খাল আর জলাশয়ের শহর। কিন্তু সেইসব খাল ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ইমারত গড়ে তোলায় মাটি তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যেও। আগে যেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ ফুট গভীরতায় সুপেয় পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে ১১০০ ফুটেরও বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে এই পানির স্তর ৪৫ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা কেবল শহরেই নয় বরং পাশের অন্তত ১০টি ইউনিয়নেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর ফলে কৃষিখাতও এক বড় ধরণের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, গ্রীষ্মকালে পানির তীব্র সংকটের কারণে সেচ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে আগামী ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বরিশাল শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূপৃষ্ঠের উপরের পানি ব্যবহারের প্রকল্প (সারফেস ওয়াটার প্ল্যান্ট) বাস্তবায়ন এবং ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি ও মহাপরিকল্পনার (মাস্টার প্ল্যান) কোনো বিকল্প নেই।
প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট এই নদীমাতৃক শহরকে আমরা নিজ হাতে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। কেবল আরামদায়ক জীবনের লোভে মাটির নিচ থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত পানি চুষে নেওয়া আর জলাশয় ভরাট করার এই যে প্রতিযোগিতা, তা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক অনিরাপদ ভবিষ্যৎ রেখে যাচ্ছে। বরিশালকে বাঁচাতে হলে এখনই নগরায়ণের গতানুগতিক ধারায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রকৃতিকে শাসন করে নয়, প্রকৃতির সাথে সন্ধি করেই আমাদের টিকে থাকতে হবে।