কুমিল্লার দাউদকান্দিতে চালবোঝাই ট্রাক উল্টে প্রাণ হারানো দিনাজপুরের ৭ জন কৃষি শ্রমিকের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। জীবনযুদ্ধের তাগিদে ধান কাটতে গিয়ে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই শ্রমিকদের স্বজনদের হাতে সহায়তার অর্থ তুলে দেওয়া হয়েছে।
মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দিনাজপুর জেলার বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার সাতজন কৃষি শ্রমিকের প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করেছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) রাতে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে তার ছোট ভাই ও দিনাজপুর জেলা জাতীয়তাবাদী দলের সহ-সভাপতি আতিকুর রহমান রাজা মাস্টার নিহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই অর্থ পৌঁছে দেন।
আর্থিক সহায়তা হস্তান্তরের সময় মন্ত্রী মহোদয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি কেবল তাৎক্ষণিক একটি উদ্যোগ। ভবিষ্যতে এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারিভাবে আরও নানা সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। এই মানবিক কর্মকাণ্ডের সময় বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্তরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, জীবনধারণের জন্য ধান কাটার মৌসুমে ১৩ জন শ্রমিকের একটি দল দিনাজপুর থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। যাতায়াত খরচ বাঁচানোর আশায় তারা একটি চালবোঝাই ট্রাকে যাত্রী হিসেবে উঠেছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার হাসানপুর এলাকায় পৌঁছালে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৭ জন শ্রমিক এবং গুরুতর আহত হন আরও অন্তত ৬ জন।
নিহতদের মধ্যে বিরামপুর উপজেলার জোতবানী ইউনিয়নের নিশিবাপুর গ্রামের চারজন টগবগে যুবক ও প্রৌঢ় রয়েছেন। তারা হলেন—সুমন (২১), আবু হোসেন (২৯), আব্দুর রশিদ (৫৮) ও বিষু মিয়া (৩৪)। অন্যদিকে নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর গ্রামের তিন বাসিন্দাও এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন—আফজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০) ও সালেক (৪৫)।
বিরামপুর ও নবাবগঞ্জ উপজেলার এই দুটি গ্রাম এখন বিষাদের চাদরে ঢাকা। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হঠাৎ হারিয়ে পরিবারগুলোতে চলছে কান্নার রোল। বিশেষ করে যারা পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন, তাদের অনুপস্থিতিতে স্বজনদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রীর পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তারা যেন স্থায়ীভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, সেটিই এখন গ্রামবাসীর চাওয়া।
আমাদের দেশের কৃষি শ্রমিকরা কতটুকু অসহায় হলে যাতায়াতের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্যবাহী ট্রাকে চড়েন, এই দুর্ঘটনা তা আবারও প্রমাণ করে দিল। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহায়তা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু সড়ক পথে এই মরণফাঁদ বন্ধ করা না গেলে এমন লাশের মিছিল চলতেই থাকবে। গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড এই শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এই নিভৃত পল্লীর মানুষগুলো যেন কেবল শোকের সময় নয়, বরং সারা বছরই রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার আওতায় থাকে, সেটিই প্রত্যাশা।