Logo
ট্রেন্ডিং: ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে প্রধান উপদেষ্টা ভাঙ্গায় অবরোধের তৃতীয় দিনে থমথমে অবস্থা, যান চলাচল স্বাভাবিক  এক মাস বাড়লো ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ ফ্যাসিস্টদের আমরা আইনের আওতায় আনবো: রেজাউল করিম মল্লিক

নববর্ষ বনাম সংক্রান্তি: একরৈখিক আধুনিকতা ও লোকায়ত কালবোধের দ্বন্দ্ব

BNJK
29 August 2026, 02:06 AM পড়তে ১ মিনিট
নববর্ষ বনাম সংক্রান্তি: একরৈখিক আধুনিকতা ও লোকায়ত কালবোধের দ্বন্দ্ব

পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উদযাপন কি কেবলই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসব, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রাজনীতি? লেখক ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহারের মতে, আধুনিক নববর্ষ উদযাপন মূলত একটি ঔপনিবেশিক সময়চেতনা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ফসল, যা বাংলার লোকায়ত জীবন ও কৃষিজীবনের চিরন্তন ছন্দকে পাশ কাটিয়ে এক কৃত্রিম আধুনিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

ফরহাদ মজহার তাঁর বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, সময়ের ধারণা নিয়ে আমাদের সমাজে দুটি ভিন্ন ধারা বিদ্যমান। আধুনিক নববর্ষের ধারণাটি দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপীয় ‘সরলরৈখিক’ (একদিকে বয়ে চলা) সময়চেতনার ওপর, যা সময়কে একটি প্রশাসনিক ও পরিমাপযোগ্য এককে পরিণত করে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ভাষায়, এটি একটি ‘শূন্য সময়’, যা রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদের শাসনকার্যের জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু বাংলার গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যে সময় হলো ‘চক্রাবর্ত’—যেখানে ঋতুর আবর্তন, ফসলের চক্র এবং প্রকৃতির ছন্দই প্রধান। এখানে শেষ এবং শুরু আলাদা কিছু নয়, বরং একটির মধ্যেই অন্যটির বসবাস।

ঔপনিবেশিক শাসনের হাত ধরে আসা এই আধুনিক ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা বাংলার কৃষিজীবনের সহজ কালবোধকে প্রান্তিক করে ফেলেছে। ফরহাদ মজহারের মতে, বর্তমানের নববর্ষ উদযাপন একটি বিশেষ মধ্যবিত্ত ও শহুরে শ্রেণির ‘প্রদর্শনমূলক’ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা বা লোকজ মোটিফের ব্যবহার এখানে মূলত একটি মুখোশ বা অভিনয়, যেখানে মাটির সাথে মানুষের প্রকৃত সম্পর্ক বা কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থার কোনো যোগসূত্র নেই। এটি সংস্কৃতিকে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া।

এই আধিপত্যের বিপরীতে তিনি ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ উদযাপনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, সংক্রান্তি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি একটি ‘অভিজ্ঞতামূলক সময়’ এবং প্রতিরোধের রাজনীতি। নয়াকৃষি আন্দোলনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সংক্রান্তি মানুষকে প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। চৈত্রসংক্রান্তিতে শাক কুড়ানো, তিতা বা টক জাতীয় ঋতুভিত্তিক খাবার গ্রহণ—এগুলো নিছক লোকাচার নয়, বরং শরীরকে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি জৈবিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চা। এখানে নারী সমাজ এক বিশাল ভূমিকা পালন করে, যারা বংশপরম্পরায় প্রকৃতির এই গভীর জ্ঞানকে বয়ে নিয়ে চলেছেন।

সবশেষে তিনি নববর্ষ ও সংক্রান্তির মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটি তুলে ধরেন। নববর্ষ হলো একটি ‘ঘোষণামূলক সময়’ যা ক্যালেন্ডারের নির্দেশে শুরু হয়, অন্যদিকে সংক্রান্তি হলো একটি ‘বাস্তব সময়’ যা প্রকৃতির রূপান্তর দেখে মানুষ নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করে। নববর্ষ সময়কে খণ্ড বিখণ্ড করে, আর সংক্রান্তি সময়কে নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় সংযুক্ত করে। তাই সংক্রান্তি পালন করা মানে হলো আধুনিক একরৈখিক সময়ের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে প্রকৃতির আপন ছন্দে নিজেকে নতুন করে চেনা।

রহাদ মজহারের এই পর্যবেক্ষণ আমাদের প্রথাগত উৎসব পালনের ধরণকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা কি আসলেই সংস্কৃতির প্রাণকে ধারণ করছি, নাকি কেবল তার বহিরাঙ্গ বা খোলস নিয়ে মেতে আছি? সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে আমরা কি ক্রমেই শেকড়হীন এক যান্ত্রিক জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? আধুনিকতার নামে নিজের লোকায়ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতালব্ধ সত্যকে বিসর্জন দেওয়া কি আমাদের জন্য আত্মঘাতী নয়? সময় ও সংস্কৃতির এই গভীর দার্শনিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি।

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
বাংলাদেশ

নববর্ষ বনাম সংক্রান্তি: একরৈখিক আধুনিকতা ও লোকায়ত কালবোধের দ্বন্দ্ব

B
BNJK | 14 April 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার