রাজধানীর ধানমন্ডির ঐতিহ্যবাহী ঢাকা সিটি কলেজে প্রশাসনিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে বিধি বহির্ভূতভাবে তৎকালীন অধ্যক্ষকে সরিয়ে বর্তমান অধ্যক্ষের দায়িত্ব দখলের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
প্রায় সাড়ে ছয় হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যাপীঠ ঢাকা সিটি কলেজ সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা কার্যক্রমের চেয়ে মারামারি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বারবার সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। তবে এবার অভিযোগের আঙুল খোদ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদের দিকে। অভিযোগ উঠেছে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কলেজে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। বর্তমান অধ্যক্ষ নিয়ামুল হক বাইরে থেকে একদল উত্তেজিত জনতাকে ডেকে এনে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ (মব জাস্টিস) তৈরি করেন। এরপর তৎকালীন অধ্যক্ষ বেদারউদ্দিন আহমেদকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই ঘটনার পরপরই নিয়ামুল হক নিজেকে অধ্যক্ষ হিসেবে ঘোষণা করে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে পদ থেকে সরাতে হলে অন্তত দুই মাস আগে নোটিশ প্রদান করতে হয়। কিন্তু বেদারউদ্দিন আহমেদের ক্ষেত্রে এই নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক, কোনো কারণে অধ্যক্ষের পদ শূন্য হলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে কেউ ছয় মাসের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। অথচ নিয়ামুল হক প্রায় ২১ মাস ধরে কোনো স্থায়ী নিয়োগ বা বিধিসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়াই নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন।
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বর্তমান অধ্যক্ষ নিয়ামুল হক চরম অসহযোগিতা প্রদর্শন করেন। তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, “আমি এই বিষয়ে কোনো কথা বলব না। আমার এখানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নেই।” তাঁর এমন আচরণে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে আরও সন্দেহের দানা বেঁধেছে।
এদিকে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এস এম আমানুল্লাহ জানিয়েছেন যে, ঢাকা সিটি কলেজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেশ বিব্রত। তিনি জানান, কলেজের পরিচালনা পর্ষদ (গভর্নিং বডি) পরিবর্তন করা হলেও উচ্চ আদালতের একটি স্থিতাদেশ (স্টে অর্ডার) থাকার কারণে আপাতত বর্তমান অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আইনি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুতই তাঁকে অপসারণের ইঙ্গিত দিয়েছেন উপাচার্য।
একটি স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন যোগ্যতার চেয়ে গায়ের জোর বড় হয়ে ওঠে, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। আইন ও বিধিবিধান পাশ কাটিয়ে পদ দখলের সংস্কৃতি শিক্ষার পরিবেশকে কলুষিত করে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সিটি কলেজের এই প্রশাসনিক অচলাবস্থা নিরসন করা এখন সময়ের দাবি, অন্যথায় এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠের গৌরব ধুলোয় মিশে যেতে পারে।