বলিউডের গ্ল্যামার আর আলোর ঝলকানি যে সবসময় সুখের বার্তা বয়ে আনে না, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে সামনে এলেন অভিনেত্রী সেলিনা জেটলি। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে নিজের বৈবাহিক জীবনের ভয়াবহ নির্যাতন, যৌতুকের দাবি এবং মানসিক যন্ত্রণার এক অন্ধকার অধ্যায় উন্মোচন করেছেন এই তারকা।
রুপালি পর্দার জনপ্রিয় মুখ সেলিনা জেটলি বর্তমানে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। একদিকে স্বামী পিটার হাগের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বিচ্ছেদের আইনি লড়াই লড়ছেন, অন্যদিকে ২০২৪ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বন্দি রয়েছেন তার আপন ভাই। বাইরের জগতের সামনে হাসিমুখে নিজেকে ধরে রাখলেও, ভেতরে ভেতরে যে তিনি কতটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিলেন, তার এক হূদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন সম্প্রতি এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে। সেলিনা আক্ষেপ করে লিখেছেন, "আপনারা আমার সেই রাতগুলো দেখেননি, যখন আমি একা কেঁদেছি। দেখেননি আমার শূন্যতায় ভরা দিনগুলো।"
সেলিনার অভিযোগের আঙুল সরাসরি তার স্বামী পিটারের দিকে। বিয়ের পরপরই নাকি পিটারের আসল এবং হিংস্র রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। ভারতীয় সংস্কৃতির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অনবরত পণের (যৌতুক বা বিয়ের উপঢৌকন) জন্য চাপ দেওয়া হতো তাকে। অভিনেত্রীর পরিবার থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকার বহুমূল্য উপহার দেওয়ার পরেও পিটারের লোভ কমেনি; বরং দামী গয়না ও নগদ টাকার জন্য সেলিনাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হতো। এমনকি মধুচন্দ্রিমার মতো সুখকর সময়েও ইতালিতে থাকাকালীন ঋতুস্রাবের তীব্র যন্ত্রণায় কাতর সেলিনার দিকে সাহায্যের হাত না বাড়িয়ে মদের গ্লাস ছুড়ে মেরেছিলেন তার স্বামী।
নিকট অতীতের স্মৃতি হাতড়ে সেলিনা আরও জানান এক অমানবিক অভিজ্ঞতার কথা। যমজ সন্তান প্রসবের মাত্র তিন সপ্তাহ পার হয়েছিল তখন। একজন মা হিসেবে সন্তানদের স্তন্যপান করানোর মতো সংবেদনশীল অবস্থায় তাকে আক্ষরিক অর্থেই বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন পিটার। সেই চরম বিপদের মুহূর্তে এক সহৃদয় প্রতিবেশীর আশ্রয়ে কোনোমতে আত্মরক্ষা করেছিলেন তিনি। বিকৃত লালসা আর সীমাহীন অবহেলার শিকার হয়ে সেলিনা বহুবার ভেবেছেন সব ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা, কিন্তু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং নিজের আত্মশক্তির জোরে তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে রূপালী জগত থেকে দূরে থাকলেও সেলিনা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তিনি বিশ্বাস করেন, এই কঠিন সংগ্রামই তাকে শান্ত থাকতে এবং একা লড়তে শিখিয়েছে। নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য শক্তিকে সম্বল করে তিনি এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই অকপট স্বীকারোক্তি কেবল ভক্তদের সহানুভূতিই কুড়ায়নি, বরং গ্ল্যামার জগতের আড়ালে থাকা পারিবারিক সহিংসতার এক নগ্ন রূপকেও সবার সামনে তুলে ধরেছে।
সেলিনা জেটলির এই আর্তনাদ আমাদের সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং লালসার এক করুণ প্রতিফলন। অনেক সময় আমরা তারকাদের চাকচিক্য দেখে তাদের জীবনকে নিখুঁত মনে করি, কিন্তু পর্দার আড়ালে তাদের লড়াইটা হয়তো সাধারণ মানুষের চেয়েও বেশি কঠিন। সেলিনা যেভাবে নিজের অন্ধকার দিনগুলোর কথা প্রকাশ্যে এনেছেন, তা অনেক নির্যাতিত নারীর জন্য সাহসের উৎস হতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক সুরক্ষা যে কতটা জরুরি, এই ঘটনাটি আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।