বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী খানজাহান আলী (রহ.) দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুরের করুণ মৃত্যুর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। এই অমানবিক ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
সম্প্রতি বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন বিশাল দিঘিতে একটি কুকুরকে কুমিরে ছিঁড়ে খাওয়ার ভিডিও ভাইরাল (ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া) হওয়ার পর মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, দিঘির পাড়ে একটি অসহায় কুকুর কুমিরের কবলে পড়লে উপস্থিত জনতা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা না করে বরং মোবাইলে ছবি ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন। মানবিকতার এই চরম অবক্ষয় এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা সুশীল সমাজকে মর্মাহত করেছে।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার খবর পাওয়ার পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিশেষ বার্তায় জানান, প্রাণীর প্রতি এমন নির্দয় আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি অবিলম্বে এই ঘটনার পেছনে কারো উস্কানি বা অবহেলা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, যারা এই ধরনের কাজে ইন্ধন দিয়েছে কিংবা সহায়তা করেছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন মাজারের দিঘিতে এমন অমানবিক দৃশ্য আর না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলেছেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর কড়া নির্দেশের পরপরই নড়েচড়ে বসেছে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন। ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিয়া খাতুনকে এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে। তদন্ত দলে আরও রয়েছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এম. শরীফ খান, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. পলাশ কুমার দাস এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদ-উল-হাসান।
তদন্ত কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। দিঘির পাড়ে কুমিরের আক্রমণ চলাকালীন স্থানীয়দের ভূমিকা কী ছিল এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কুকুরটিকে কুমিরের সামনে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাজার সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে দর্শনার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাণিকুল রক্ষায় অতিরিক্ত প্রহরীর ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও করছে প্রশাসন।
একটি নিরীহ প্রাণীর জীবন যখন সংকটে, তখন একদল মানুষের ভিডিও ধারণ করার নেশা আমাদের মানবিক মূল্যবোধের দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে। খানজাহান আলী (রহ.)-এর দিঘি একটি পবিত্র ও ঐতিহাসিক স্থান, যেখানে প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্প্রীতিই মূল শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল। প্রশাসনের এই তদন্ত কেবল দোষীদের শাস্তি নয়, বরং সাধারণ মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলার একটি সুযোগ হওয়া উচিত। বন্যপ্রাণী ও পোষা প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত না করতে পারলে আমাদের ইকোসিস্টেম (প্রাকৃতিক ভারসাম্য) এবং মানবিক সমাজ—উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে।