‘বাবা’—শব্দটি ছোট হলেও এর বিশালতায় লুকিয়ে থাকে নির্ভরতা, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, আত্মত্যাগ আর নিশ্চুপ এক ভালোবাসা। কিন্তু বাস্তবতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে, প্রজন্মের ব্যবধানে কিংবা নিছক না-বলা অভিমানের বশে বাবার সঙ্গে সন্তানের মানসিক দূরত্ব যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। একই ছাদের নিচে বসবাস করেও অনেক পরিবারে বাবা ও সন্তানের মধ্যে কেবল আনুষ্ঠানিক দু-চারটি কথার বাইরে তেমন কোনো আলাপ হয় না। আগামী ২১ জুন বাবা দিবস। দিনটি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দিয়ে লোকদেখানো শুভেচ্ছা জানানোর নয়, বরং ভেঙে পড়া সম্পর্কের সেতু নতুন করে নির্মাণের এক দারুণ সুযোগ।
আমাদের সমাজে মায়েরা যতটা সহজে সন্তানের কাছে নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতে পারেন, বাবারা ঠিক ততটাই অন্তর্মুখী। তারা ভালোবাসেন কাজের মধ্য দিয়ে, নিঃশব্দে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। ছোটবেলা থেকেই সমাজ তাদের শেখায় আবেগ চেপে রাখতে। ফলে সন্তানও ধীরে ধীরে ধরে নেয়, ‘বাবা হয়তো আমাকে বুঝবেন না’। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান প্রজন্মের প্রযুক্তি-নির্ভর ভীষণ ব্যস্ত জীবন। মুঠোফোন বা অন্তর্জালের (ইন্টারনেট) মায়াবী পর্দায় চোখ রাখতে গিয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি পাশের ঘরে বসা মানুষটির কথা। ফলে দীর্ঘ হচ্ছে দূরত্বের দেয়াল।
তবে একটু সচেতন হলেই এই অদৃশ্য দেয়াল ভাঙা সম্ভব। বাবার সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করতে খুব বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের ছোট ছোট আলাপচারিতাই হতে পারে জাদুকরী। ‘আজ শরীর কেমন?’, ‘দিনটা কেমন কাটল?’ বা ‘এক কাপ চা খাবেন?’—এমন অতি সাধারণ প্রশ্নগুলোও বাবার মনে প্রশান্তি এনে দেয়। তিনি অনুভব করেন, সন্তান তার খেয়াল রাখছে।
প্রত্যেক বাবার বুকেই কিছু না-বলা সংগ্রামের গল্প থাকে, যা হয়তো কখনও কাউকে বলা হয়ে ওঠেনি। কিছুটা সময় বের করে তার অতীত জীবনের গল্প শুনুন। বাবাকে কেবল পরিবারের উপার্জনকারী এক যন্ত্র না ভেবে, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করার চেষ্টা করুন। তারও তো ক্লান্তি, একাকীত্ব ও অপূর্ণ অনেক স্বপ্ন রয়েছে। মুঠোফোন দূরে সরিয়ে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়া, টেলিভিশনে খেলা দেখা কিংবা তার পছন্দের কোনো কাজে (যেমন: বাগান করা বা পুরোনো গান শোনা) অংশ নেওয়া সম্পর্ককে আরও নিবিড় করে তোলে।
অনেক সময় কড়া শাসন বা অপূর্ণ প্রত্যাশা থেকে সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে নিঃসঙ্কোচে ক্ষমা চাইতে শিখুন। নিজের ভুল স্বীকার করে ‘দুঃখিত’ বললে কেউ ছোট হয় না, বরং এটি পরিণত মানসিকতার প্রমাণ। সবচেয়ে বড় কথা, বাবাকে তার ত্যাগের জন্য স্বীকৃতি দিন। ‘আপনার জন্যই আজ আমি এতদূর এসেছি’—সন্তানের মুখের এই একটি বাক্য একজন বাবার সারা জীবনের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিতে পারে।
সম্পর্কের দূরত্ব এক দিনে যেমন তৈরি হয় না, তেমনি এক দিনে তা পুরোপুরি ঘোচানোও সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের সূচনা হোক আজ থেকেই। এবারের বাবা দিবসে কেবল শুভেচ্ছাবার্তায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাবার পাশে বসে তার হাতটি ধরুন। তার নিশ্চুপ ত্যাগের গল্পগুলো অনুভব করার চেষ্টা করুন। একটু কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেই দেখবেন, তার কড়া শাসনের পেছনেও লুকিয়ে ছিল আপনার জন্যই এক পৃথিবী ভালোবাসা।