কিশোরগঞ্জের ভৈরবে কোমলমতি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে পচা ডিম, নিম্নমানের কলা ও ছত্রাক ধরা বনরুটি, যা খেয়ে অনেক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টির মানোন্নয়নে চালু হওয়া সরকারি খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমে চরম অবহেলার চিত্র ফুটে উঠেছে। গত শনিবার (১১ এপ্রিল) পৌর শহরের কমলপুর জনাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রামশংকরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের যে টিফিন দেওয়া হয়, তা ছিল পুরোপুরি খাওয়ার অনুপযুক্ত। অনেক প্যাকেটে পচা ডিমের উৎকট গন্ধ এবং রুটির গায়ে কালচে ছত্রাক (এক ধরনের ক্ষতিকর পরজীবী উদ্ভিদ) দেখে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা স্তম্ভিত হয়ে যান।
উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভৈরবের ৯১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় দুই হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর জন্য এই পুষ্টিকর খাবার বিতরণের দায়িত্ব পেয়েছে ‘ফাস্ট এস এস এন্টারপ্রাইজ প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে মাঠ পর্যায়ে তাদের দেওয়া খাবারের মান নিয়ে শুরুতেই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জনাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনির হোসেনের বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার দুই সন্তান এই স্কুলে পড়ে। শনিবার তাদের যে ডিম দেওয়া হয়েছে তা পচা ছিল, আর রুটিতে ছিল ছত্রাক। এই পচা খাবার খেয়ে এলাকায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ বোধ করছে। শিশুদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি আমরা মেনে নেব না।”
একই সুর স্থানীয় বাসিন্দা ফারুক মিয়া ও ওমর মোহাম্মদ অপুর কণ্ঠেও। তারা জানান, সরকার শিশুদের স্কুলমুখী করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, কিন্তু অসাধু ঠিকাদারদের কারণে এই মহৎ উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। যারা শিশুদের মুখে বিষ তুলে দিচ্ছে, তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকরা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। জনাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিনা বেগম জানান, সকালে ২০০ শিক্ষার্থীর হাতে প্যাকেট তুলে দেওয়ার পর বিষয়টি নজরে আসে। প্রথমে বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও পরে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করলে তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জানান। অন্যদিকে রামশংকরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাসলিমা বেগম বলেন, নিম্নমানের খাবারের বিষয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে এবং তারা ভবিষ্যতে ভালো মানের খাবার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ছিদ্দিকুর রহমান বিষয়টিকে দুঃখজনক অভিহিত করে বলেন, শিশুদের খাবারের মান নিয়ে কোনো আপস করা হবে না। ভবিষ্যতে যাতে কোনো অস্বাস্থ্যকর খাবার বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, একাধিক বিদ্যালয় থেকে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সত্যতা পেয়েছেন। তিনি বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলার এই অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্কুল ফিডিং প্রকল্প কেবল একটি খাবার বিতরণ কর্মসূচি নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের একটি রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি। যখন সেই খাবারে পচা ডিম বা ছত্রাকযুক্ত রুটি পাওয়া যায়, তখন তা কেবল দুর্নীতির প্রমাণ দেয় না, বরং শিশুদের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সরকারি তদারকি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী না হলে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা না দিলে এ ধরনের মহৎ প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে। প্রশ্ন থেকে যায়, আর কতদিন শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে এই মুনাফালোভী বাণিজ্য চলবে?