পুরনো বছরের সব জীর্ণতা মুছে ফেলে নতুন সূর্যকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কীর্তনখোলা তীরের শহর বরিশাল। বাঙালির হাজার বছরের শেকড়ের সংস্কৃতি আর লোকজ আভিজাত্যে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে নগরীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন উৎসবের আমেজে মুখরিত।
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ কড়া নাড়ছে দুয়ারে। এই মাহেন্দ্রক্ষণকে সামনে রেখে বরিশাল চারুকলা প্রাঙ্গণ এখন শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের রঙ-তুলির আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে চারুকলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, কেউ বাঁশ আর কাগজের কাটাকুটিতে ব্যস্ত, কেউবা মাটির সরায় আঁকছেন গ্রামীণ জীবনের আল্পনা। ব্যস্ততার এই ছবিই বলে দিচ্ছে, উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে।
বরিশালের এবারের বর্ষবরণের প্রধান আকর্ষণ হতে যাচ্ছে চারুকলার আয়োজিত বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা (মঙ্গল শোভাযাত্রা)। আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এবারের শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকবে বিশাল আকৃতির একটি টিয়া পাখি। এর পাশাপাশি বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে বৈচিত্র্যময় সব মুখোশ। এসব শিল্পকর্মের মাধ্যমে আবহমান বাংলার রূপকে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন নবীন ও প্রবীণ শিল্পীরা।
প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত শিক্ষার্থী রনি জানান, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎসব। এই উৎসবকে সফল করতে প্রতি বছরের মতো এবারও তারা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। চারুকলা বরিশালের সমন্বয়ক সুশান্ত ঘোষের মতে, বৈশাখী উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে ফসলের ঘ্রাণ আর কৃষকের স্বপ্ন। হেমন্তের নতুন ধান ঘরে তোলার যে আনন্দ থেকে এই উৎসবের সূচনা, আজ তা রূপ নিয়েছে সার্বজনীন এক মিলনমেলায়।
এদিকে নগরীর ব্রজমোহন (বিএম) স্কুল প্রাঙ্গণে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজন করেছে তিন দিনব্যাপী বিশাল বৈশাখী মেলা। প্রায় চার দশক ধরে চলে আসা এই মেলায় এবার প্রায় ৭০টি বিভিন্ন ধরনের দোকান (স্টল) স্থান পাবে। উদীচীর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল খায়ের সবুজ জানান, ৪৪ বছর ধরে তারা এই মেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। পহেলা বৈশাখের ভোরে প্রভাতি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসবের শুরু হবে। এরপর দিনভর চলবে গান, নৃত্য ও কবিতা আবৃত্তির আসর।
বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শুভঙ্কর চক্রবর্তী জানিয়েছেন, আগামী ১৪ এপ্রিল সকালে বিএম স্কুল মাঠ থেকে শুরু হবে মূল শোভাযাত্রাটি। এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে তারা কেবল নতুন বছরকে স্বাগতই জানাচ্ছেন না, বরং সমাজের ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক জোরালো বার্তা দিতে চান। শোভাযাত্রাটি বিএম স্কুল থেকে শুরু হয়ে নগরীর সদর রোডে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
নগরীর প্রায় ৩৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠন এখন এই কর্মযজ্ঞে শরিক হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে নাচে-গানে আর ঐতিহ্যের মিশেলে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত দক্ষিণাঞ্চলের এই বিভাগীয় শহর।
যান্ত্রিকতার এই যুগে পহেলা বৈশাখ আমাদের শেকড়ের কাছে ফেরার তাগিদ দেয়। বরিশালের এই ব্যাপক প্রস্তুতি প্রমাণ করে যে, বিশ্বায়নের ঝড়েও বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি আজও অমলিন। শোভাযাত্রার টিয়া পাখি কিংবা বৈচিত্র্যময় মুখোশগুলো আসলে আমাদের পরিচয়কেই তুলে ধরে। এই ঐক্যবদ্ধ উৎসব আমাদের জাতিগত সম্প্রীতিকে আরও দৃঢ় করবে—এটাই প্রত্যাশা।