রাজধানীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাসহ দেশজুড়ে একের পর এক ঘটে যাওয়া শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শায়খ আহমাদুল্লাহ। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদরাসায় শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের মতো অনাচার রুখতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে পূর্বের দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশমালা পুনরুল্লেখ করেছেন।
শনিবার (২৩ মে) সন্ধ্যায় নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় দেওয়া এক বার্তায় শায়খ আহমাদুল্লাহ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। বর্তমানে পবিত্র হজের সফরে সৌদি আরব অবস্থান করার কারণে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ না পেলেও, দেশে ফিরে তিনি এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা পেশ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে চলমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি ২০১৯ সালে নিজের পেশ করা বেশ কয়েকটি সুপারিশ আবারো সবার সামনে তুলে ধরেন।
শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর বার্তায় স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন যে, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নানাবিধ নৈতিক অবক্ষয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত অনাচারের ঘটনা ঘটছে, যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক—সে কোনো মাদরাসার হোক কিংবা বাইরের—তাকে আইনের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মাদরাসায় যৌন নিপীড়নের মতো অত্যন্ত ঘৃণ্য ও লজ্জাজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যদি আলেম সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনই নীরবতা ভেঙে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে এই সমস্যা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
যৌন অনাচার প্রতিরোধে তাঁর দেওয়া ২০১৯ সালের সুপারিশমালার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মাদরাসার প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক কক্ষকে ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন বা সিসিটিভি (ভিডিও নজরদারি ব্যবস্থা) প্রযুক্তির আওতায় আনা।
২. শিক্ষকদের নিয়মিত ও যথাযথ আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৩. মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য পারিবারিক আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নিয়মতান্ত্রিক ছুটির ব্যবস্থা রাখা।
৪. শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ ও আবাসিক আবাসন ব্যবস্থা একই স্থানে না রেখে আলাদা করা।
৫. শিক্ষার্থীদের জন্য ঢালাও বিছানার পরিবর্তে পৃথক খাটের ব্যবস্থা করা।
৬. নারী বা বালিকা মাদরাসায় কোনো অবস্থাতেই পুরুষ শিক্ষক কিংবা পুরুষ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ না দেওয়া।
মাদরাসায় ঘটে যাওয়া অনাচার বন্ধের দাবির পাশাপাশি শায়খ আহমাদুল্লাহ অন্য একটি স্পর্শকাতর দিক নিয়েও সতর্ক করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বলাৎকারের ঘটনা যেমন সত্য, তেমনই অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সত্যের সাথে মিথ্যার রং মিশিয়ে অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রচার করে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসল অপরাধীকে আড়াল করতে নিরীহ ইমাম বা আলেমদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ষড়যন্ত্রও করা হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে ফেনীর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মক্তব শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক ডিএনএ (বংশানুক্রমিক উপাদান) পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, ঐ কিশোরীর গর্ভজাত সন্তানের পিতা ইমাম নন, বরং কিশোরীর নিজের আপন বড় ভাই।
তিনি আরও লক্ষ্য করেছেন যে, বড় এবং সুপ্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলোতে এই ধরনের অনৈতিক ঘটনা তেমন একটা শোনা যায় না। বরং মূল স্রোতধারার বাইরে যত্রতত্র গড়ে ওঠা ছোট ছোট এবং অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসাগুলোতেই এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। তবে প্রতিষ্ঠান ছোট হোক বা বড়, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো চিরতরে বন্ধ করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তিনি কওমি মাদরাসাগুলোর সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী বোর্ড ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর কাছে একটি বিশেষ প্রস্তাব পেশ করেন।
তিনি আহ্বান জানান, শীর্ষস্থানীয় আলেম এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্থায়ী শক্তিশালী তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। যেখানেই কোনো যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠবে, এই কমিশন সরাসরি সেখানে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করবে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে অপরাধীকে আইনের মুখোমুখি করার পাশাপাশি তাকে স্থায়ীভাবে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা হবে, যাতে সে আর কখনো অন্য কোনো মাদরাসায় চাকরি পেতে না পারে। আর যদি অভিযোগটি মিথ্যা বা ষড়যন্ত্রমূলক প্রমাণিত হয়, তবে তাও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতির সামনে পরিষ্কার করা হবে।
শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, বর্তমানে দেশজুড়ে সামগ্রিক মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার যে ভাবমূর্তি সংকট তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে এবং সাধারণ মানুষের মনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ও সুধারণা বজায় রাখতে এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বীনের দুর্গ হিসেবে পরিচিত মাদরাসা ব্যবস্থাকে সুরক্ষার জন্য দলমত নির্বিশেষে সকলকে একসাথে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
ধর্মীয় বা সাধারণ—যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিশুদের নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। শায়খ আহমাদুল্লাহর দেওয়া প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত বাস্তবমুখী এবং কার্যকর। বিশেষ করে আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভিডিও নজরদারি বৃদ্ধি, পৃথক বিছানার ব্যবস্থা এবং আলেমদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করার বিষয়টি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। কোনো অপরাধীকে আড়াল না করে তাকে বিচারের আওতায় আনা এবং একই সাথে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা থেকে নির্দোষ ব্যক্তিদের রক্ষা করা—এই দ্বিমুখী ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পবিত্রতা রক্ষা করতে এখন কেবল আলোচনার টেবিলে নয়, বাস্তব ময়দানে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।