সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ে সেজে সখ্যতা গড়ে তোলা, তারপর কৌশলে অপহরণ করে নিজের গোপন আস্তানায় নিয়ে পাশবিক নির্যাতন—এমনই এক রোমহর্ষক অপরাধচক্রের হোতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান শেষে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে এই দুর্ধর্ষ ‘সিরিয়াল রেপিস্ট’ বা ধারাবাহিক যৌন অপরাধীকে জালে তুলতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ভয়ংকর ফাঁদ ও আস্তানার নেপথ্যে
রাজধানীর মিরপুর এলাকার কিশোরী ও তরুণীদের লক্ষ্য করে জাল বিস্তার করত ৩০ বছর বয়সী রাশেদুল ইসলাম রাব্বি। সে অত্যন্ত সুকৌশলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর ছদ্মবেশে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলত। দীর্ঘ আলাপের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস অর্জন করার পর সে তাদের দেখা করার জন্য মেট্রো স্টেশনের নিচে আসতে প্রলুব্ধ করত।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ভুক্তভোগীরা যখনই দেখা করতে আসত, রাব্বি তাদের নানা কৌশলে যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজ ও বর্ণমালা স্কুল সংলগ্ন তার নিজস্ব আস্তানায় (গোপন ডেরা) নিয়ে যেত। দিনের বেলা এবং রাতের অপরাধের জন্য তার আলাদা দুটি আস্তানা ছিল। সেখানে নিয়ে ভুক্তভোগীদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালানো হতো এবং সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করা হতো। পরবর্তীতে এই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মাসের পর মাস টাকা হাতিয়ে নিত এই অপরাধী।
যেভাবে ধরা পড়ল এই চক্র
বুধবার (১৫ এপ্রিল) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী জানান, গত সোমবার সন্ধ্যায় দনিয়া কলেজের সামনে থেকে রাশেদুলকে গ্রেফতার করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। মূলত একটি পর্নোগ্রাফি বা পর্ণচিত্র সংক্রান্ত অভিযোগের সূত্র ধরে তাকে ধরা হলেও, তল্লাশিতে বেরিয়ে আসে আরও রোমহর্ষক সব তথ্য।
গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে ৫ জন ভুক্তভোগী নারীর ৫টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও অন্তত ১০টি নতুন অভিযোগের তথ্য মিলেছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, রাশেদুল এতটাই চতুর যে তার বর্তমান স্ত্রীকেও একইভাবে ফাঁদে ফেলে এবং ব্ল্যাকমেইল (ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়) করে বিয়ে করতে বাধ্য করেছিল।
প্রযুক্তিতে দক্ষ ও বেপরোয়া আচরণ
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মুন্সীগঞ্জের পুরান কামারগাঁ এলাকার শাহজাহান মল্লিকের ছেলে রাশেদুল প্রযুক্তিগতভাবে বেশ দক্ষ। সে ভুক্তভোগীদের ফোন কেড়ে নিয়ে সব তথ্য নিজের দখলে রাখত। ভিডিও মুছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বারবার টাকা আদায় করত। উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোনগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় সবার সঙ্গেই একই কায়দায় যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছে।
পুলিশের আশঙ্কা, রাশেদুলের শিকার হওয়া নারীর সংখ্যা কয়েক ডজন ছাড়িয়ে যেতে পারে। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের (পুলিশি হেফাজত) আবেদন জানানো হয়েছে। এই চক্রের সাথে আরও কেউ জড়িত কি না, তাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষণ ও উপসংহার
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন আমাদের জীবন সহজ করেছে, তেমনি এর আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা রাশেদুলের মতো অপরাধীরা সমাজকে চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোনো অপরিচিত আইডির সাথে সখ্যতা গড়ার ক্ষেত্রে আমাদের আরও সতর্ক হওয়া জরুরি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের উচিত ইন্টারনেটে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবারের সাথে আলোচনা করা এবং জনশূন্য স্থানে কারো সাথে দেখা করতে না যাওয়া। রাশেদুলের এই গ্রেফতার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটি সবসময় বন্ধু নয়, কখনো কখনো সে হতে পারে এক ভয়ংকর শিকারি। আপনার নিরাপত্তা আপনার সচেতনতার ওপরই নির্ভর করছে।