রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলায় পাওনা টাকাকে কেন্দ্র করে এক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গভীর রাতে নিজ বাসায় দিয়া (২০) নামে এক কলেজছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক পাষণ্ড ঠিকাদার। এ সময় ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন নিহতের মা ও তার দুই ছোট ভাই-বোন।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার কাজলা ভাঙা প্রেস এলাকায় সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে এক পৈশাচিক হামলার ঘটনা ঘটে। দিয়া নামের এক তরুণী শিক্ষার্থী যখন তার পরিবারের সাথে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই নৃসংশতার শিকার হতে হয় তাদের। জানা গেছে, হামলাকারী মুসা নামের এক ঠিকাদার তাদের পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়া ছিলেন এবং ভুক্তভোগীদের নিজেদের বাড়ির নির্মাণকাজের দায়িত্বেও ছিলেন।
পারিবারিক সূত্র ও গাড়িচালক বিল্লাল হোসেনের বর্ণনামতে, বাড়ির মালিক নুসরাত জাহান মৌসুমীর কাছে নির্মাণকাজের কিছু টাকা পাওনা ছিলেন মুসা। এই টাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুপক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ চলছিল। সোমবার গভীর রাতে মুসা হঠাৎ মৌসুমীর বাসায় উপস্থিত হন এবং দীর্ঘ সময় কথাবার্তা বলেন। একপর্যায়ে ‘কাকি আমাকে মাফ করে দিয়েন’ বলে অতর্কিতে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা চাপাতি বের করে মৌসুমিকে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করেন।
মায়ের চিৎকার শুনে তাকে বাঁচাতে ছুটে আসে তিন সন্তান—বড় মেয়ে দিয়া, মেজো ছেলে মোয়াজ (১৫) এবং ছোট মেয়ে জয়া (১২)। ঘাতক মুসা তখন কাউকেই রেহাই দেয়নি। মায়ের জীবন বাঁচাতে গিয়ে চাপাতির আঘাতে প্রাণ হারান শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া। গুরুতর আহত অবস্থায় বাকিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক দিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন।
বর্তমানে নুসরাত জাহান মৌসুমী এবং তার দুই সন্তান জয়া ও মোয়াজ রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হামলায় মৌসুমীর বাম হাতের কবজি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জয়া ও মৌসুমীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, আহত জয়া একটি মাদ্রাসায় এবং মোয়াজ স্কুলে পড়াশোনা করে।
যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঘাতক মুসা মিয়া নিজেও এই ঘটনায় সামান্য আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে পুলিশি পাহারায় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ তাকে ইতিমধ্যে আটক করেছে। টাকার লেনদেনের বিষয়টিকে প্রাথমিক কারণ হিসেবে দেখা হলেও এর পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য বা শত্রুতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ জোর তদন্ত চালাচ্ছে।
একটি সামান্য আর্থিক লেনদেন কিংবা পাওনা টাকাকে কেন্দ্র করে এমন পাশবিক হত্যাকাণ্ড আধুনিক সমাজব্যবস্থায় নৈতিক অবক্ষয়েরই চরম বহিঃপ্রকাশ। একজন তরুণী শিক্ষার্থীর প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়া এবং একটি পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুঝুঁকি আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করে, তেমনি মানুষের ভেতরকার চরম অসহিষ্ণুতার চিত্রটি ফুটিয়ে তোলে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে ভবিষ্যতে এমন জঘন্য অপরাধ রোধ করতে।