যশোর-খুলনা মহাসড়কের যশোর সদর উপজেলায় একটি দ্রুতগতির পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যানের চাপায় মা ও শিশু সন্তানসহ চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শনিবার দুপুরের এই দুর্ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা ঘাতক গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে।
যশোর প্রতিনিধি: সড়কে ঝরল আরও চারটি তাজা প্রাণ। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যশোর-খুলনা মহাসড়কের সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের রূপদিয়ার চাউলিয়া ফিলিং স্টেশনের (জ্বালানি তেল সরবরাহ কেন্দ্র) সামনে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে। একটি বেপরোয়া কাভার্ড ভ্যান প্রথমে একটি যাত্রীবাহী ইজিবাইককে (ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান) চাপা দেয় এবং পরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আরেকটি ভ্যানকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুজন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়।
যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানান, খুলনা থেকে যশোরগামী একটি দ্রুতগতির কাভার্ড ভ্যান চাউলিয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী ইজিবাইককে সজোরে চাপা দেয়। এরপর কাভার্ড ভ্যানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে থাকা আরও একটি ভ্যানকে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে পড়ে। মুখোমুখি এই তীব্র সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ইজিবাইকের আরোহী বৃষ্টি সাহা ও আইয়ুব আলী নামের দুই যাত্রী প্রাণ হারান।
নিহতরা হলেন—যশোর সদর উপজেলার রূপদিয়া সাহাপাড়া গ্রামের সুজন সাহার স্ত্রী বৃষ্টি সাহা (২৫) ও তার পাঁচ বছরের শিশু সন্তান সৌভিক সাহা, একই এলাকার আইয়ুব হোসেন (৪৩) এবং ভ্যানচালক রূপদিয়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন (৬০)। এ ঘটনায় মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মশিয়ার রহমানের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন (২৮) নামের আরেক যুবক গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহত শিশু সৌভিকের কাকা মিঠুন সাহা জানান, প্রতিদিনের মতো বৃষ্টি সাহা তার পাঁচ বছরের ছেলে সৌভিককে স্থানীয় বিদ্যালয় থেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ইজিবাইকে করে বাড়ি ফেরার পথেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন মা ও ছেলে।
দুর্ঘটনার পর পরই স্থানীয় বাসিন্দারা রক্তাক্ত অবস্থায় আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে (প্রধান সরকারি হাসপাতাল) নিয়ে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শাকিরুল ইসলাম জানান, ভ্যানচালক আনোয়ার হোসেনকে হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। অন্যদিকে, গুরুতর আহত শিশু সৌভিক সাহাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা হলেও দুপুর ১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছেন ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক তন্ময়।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে রূপদিয়া ও আশপাশের শত শত ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। তারা ঘাতক কাভার্ড ভ্যানটিকে অবরুদ্ধ করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। উত্তেজিত জনতার অবরোধের কারণে ব্যস্ততম যশোর-খুলনা মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল প্রায় এক ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের দুপাশে শত শত যানবাহন আটকে পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
খবর পেয়ে যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের (দমকল বাহিনী) কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দমকল বাহিনীর চেষ্টায় কাভার্ড ভ্যানের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতাকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করলে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুনরায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। পুলিশ ঘাতক কাভার্ড ভ্যানটি জব্দ করেছে, তবে চালক ও সহকারী ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে।
এই দুর্ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে আমাদের জাতীয় মহাসড়কগুলো সাধারণ মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মহাসড়কে দ্রুতগতির ভারী যানবাহনের পাশাপাশি ইজিবাইক ও ভ্যানের মতো ধীরগতির তিন চাকার গাড়ি অবাধে চলাচল করায় এই ধরনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। বিদ্যালয়ের শিশুশিক্ষার্থীদের নিয়ে ঘরে ফেরার মতো সাধারণ একটি পথও এখন নিরাপদ নয়। কেবল চালকদের সচেতনতা নয়, বরং মহাসড়কে অননুমোদিত ছোট যান চলাচল বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বিকল্প যাতায়াত ব্যবস্থার কথা এখন নীতি নির্ধারকদের গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে।